(প্রিয়.কম) রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ঐকমত্য পোষণ করেছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। ১৩ অক্টোবর শুক্রবার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

ব্রিটিশ ও ফরাসি ডেলিগেশনের আয়োজনে জাতিসংঘ সদর দফতরের ইকোসক চেম্বারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত। আরিয়া ফর্মুলার অধীনে আয়োজিত ওই বৈঠকটি সদস্য রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজভুক্ত সংগঠনগুলোর জন্য উন্মুক্ত থাকলেও সেখানে সাংবাদিকদের থাকতে দেওয়া হয়নি। তবে বৈঠকে শেষে ‘এ্যাডভাইজরি কমিটি অন রাখাইন স্টেটে’র চেয়ারম্যান নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান সাংবাদিকদের সাথে বৈঠকের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

সভা শেষে কফি আনান সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ বাস্তবায়নে সমর্থন দিয়েছেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তিনি বলেন, সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, উপদ্রুত এলাকায় অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ত্রাণ পৌঁছানোর এবং সব উদ্বাস্তুর নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সবাই একমত হয়েছে। 

কক্সবাজারের উখিয়ায় পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে গড়ে ওঠা একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

কক্সবাজারের উখিয়ায় পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে গড়ে ওঠা একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

বৈঠকৈ ‘রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তাবাহিনীর সামরিক তৎপরতা বন্ধ হয়েছে। সেখানে আর কোনো সহিংসতা নেই’ দাবি করেন জাতিসংঘে মিয়ানমারের প্রতিনিধি ও দেশটির সামরিক উপদেষ্টা।

তবে মিয়ানমার প্রতিনিধির ওই বক্তব্যে সন্দেহ প্রকাশ করে কফি আনান বলেন, ‘সহিংসতা যদি বন্ধ হয়, তবে মানুষ কেন এখনও দলে দলে দেশ ছাড়ছে? তারা কি ক্ষুধার কারণে, সন্ত্রাসী দলের তৎপরতায়, না কি রোহিঙ্গাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়ে দেশ ছাড়ছে?’

এ সময় কফি আনান জোর দিয়ে বলেন, কারণ যাই হোক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তাদেরকে (রোহিঙ্গা) মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে তারা সেখানে নিরাপত্তার আঁচ অনুভব করে। একইসঙ্গে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাখাইন রাজ্য পুর্নর্গঠনে তাদের সহায়তা করুন’।

তিনি আরও বলেন, যারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে তাদের কোনো আশ্রয়শিবিরে রাখা যাবে না। নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে দিতে হবে। নতুন জীবনের জন্য সব সহায়তা দিতে হবে। এ সময় কফি আনান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংশোধনের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।

সেনা অভিযানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা শিবিরে আগুন দিয়েছে বার্মিজ সৈন্যরা। ছবি: সংগৃহীত

সেনা অভিযানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা শিবিরে আগুন দিয়েছে বার্মিজ সৈন্যরা। ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদ কী ধরণের উদ্যোগ নিতে পারে? এমন এক প্রশ্নের জবাবে কফি আনান বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করবে যাতে উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ও সম্মানজন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেবে। তারা শুধু ফিরে গেলেই হবে না, তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে গত ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ তৃতীয়বারের মতো আলোচনায় বসে। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠক কোনোরূপ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৬ লাখেরও বেশি। এদিকে পালিয়ে আসার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলার সময় এখনও হয়নি বলে জানান সংস্থাটির মুখপাত্র। জাতিসংঘ আরও জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনে নেমেছে

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশই নারী ও শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশই নারী ও শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯০ ভাগই হলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর মধ্যে ১১শ’র বেশি রোহিঙ্গা শিশু পরিবার ছাড়া অচেনাদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আর এসব শিশুর চোখের সামনেই তাদের বাবা-মাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা, মা-বোনদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।

অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুরিয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২১৪টি রোহিঙ্গা অধুষ্যিত গ্রাম।  

প্রিয় সংবাদ/রিমন