(প্রিয়.কম) বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বাজারেও ক্যামেরার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অপোর নতুন ডুয়েল সেলফি ক্যামেরার অপো এফ৩ সেলফি এক্সপার্ট স্মার্টফোন। মে মাসে দেশের বাজারে উন্মোচিত হওয়া নতুন এই সেলফি ফোন হচ্ছে অপোর প্রথম ১২০ ডিগ্রি ওয়াইড অ্যাঙ্গেলের ডুয়েল সেলফি ক্যামেরা সমৃদ্ধ ফোন। এর সামনে১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা এবং পেছনে ১৩ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। দ্রুতগতির অক্টা-কোর প্রসেসর ও ৪ জিবি র‍্যাম এবং ৬৪ জিবি রমের এই হ্যান্ডসেটটির ব্যাটারি ৩ হাজার ২০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার যা ২৮৪ ঘন্টার বেশি সময় স্ট্যান্ডবাই ব্যবহার করা যাবে। ভিওওসি ফ্ল্যাশ চার্জের মাধ্যমে স্বাভাবিক ব্যাটারির তুলনায় এই ব্যাটারি চার গুন দ্রুত চার্জ হবে এবং ব্যবহারকারী মাত্র পাঁচ মিনিট চার্জ দিয়ে ২ ঘন্টা পর্যন্ত কথা বলতে পারবেন।  

এই স্মার্টফোনটির খুঁটিনাটি রিভিউ নিয়ে প্রিয়.কম’র পাঠকদের জন্য এই আয়োজন। চলুন, কথা না বাড়িয়ে স্মার্টফোনটি সম্পর্কে খুব অল্প সময়ে প্রায় সব প্রধান তথ্যগুলো জেনে নেয়া যাক। তবে বিস্তারিত রিভিউ এর পূর্বে প্রথমে স্মার্টফোনটি আনবক্স করলে কী পাওয়া যাবে তা সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

আনবক্সিং 

বক্সটি খুললেই ভেতরে যা পাওয়া যাবেঃ

একটি অপো এফ৩ স্মার্টফোন

একটি ব্যাক কভার

একটি হেডফোন

একটি চার্জার অ্যাডাপ্টার

একটি ট্রাভেল চার্জার

একটি সিম ইজেক্টর টুল

একটি ইউজার ম্যানুয়াল ও

একটি ওয়ারেন্টি কার্ড

ডিজাইন

এফ৩-এর ৫.৫ ইঞ্চি বডি আরও হালকা এবং স্লিম যার ফলে আপনি পাবেন আরামদায়ক গ্রিপ। এর মসৃণ টেক্সচার এবং ধুলো নিবারক মেটাল ব্যাক প্যানেল ফোনটি হাতে নিলেই আপনাকে দেবে অন্যরকম আনন্দ। এর প্রতিটি অংশ এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যাতে সকলেই এর সৌন্দর্য এবং গ্রহণযোগ্যতায় হয়ে ওঠে মোহিত। এফ৩-তে আছে এফএইচডি ইন-সেল টেকনোলজি যা এফ৩-এর স্ক্রীনের ঘনত্বকে সাধারণ স্ক্রীনগুলোর এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। এর ফলে স্ক্রীনটি হয়েছে আরও উজ্জ্বল, রয়েছে হাই পেনিট্রেশন রেট এবং দিনের আলোতে আপনি যা-ই দেখবেন তা দেখাবে আরও স্বচ্ছ ও রঙিন।

অসাধারণ বিল্ড কোয়ালিটির এই স্মার্টফোনটির একদম উপরের দিকে প্রাইমারী মাইক্রোফোনটি প্লেস করা হয়েছে। ডিভাইসটির ডানে দেখতে পাবেন এর সিম ও মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট ও পাওয়ার বাটন এবং বামে পাবেন ভল্যিউম রকার । ডিভাইসটিতে দুটি রেগুলার মাইক্রো সিম স্লটের পাশাপাশি একটি মাইক্রো এসডি কার্ড স্লট ব্যবহার করা হয়েছে। এর একদম নিচে বামে রয়েছে স্পীকার গ্রিল, ডান দিকেরটি একটি ৩.৫ মিলিমিটার হেড ফোন জ্যাক! দুটি স্লটের মাঝে আছে একটি মিনি ইউএসবি পোর্ট। 

ফোনটির একদম টপ ফ্রন্টের বাম পাশে আছে ৮ মেগাপিক্সেল ওয়াইড এ্যাঙ্গেল ক্যামেরা, তারপরে আছে সেলফির জন্য আছে ১৬ মেগাপিক্সেলের আরেকটি ফ্রন্ট ফেসিং ক্যামেরা, স্পিকার এবং প্রক্সিমিটি সেন্সর। এর একদম নিচের দিকে আছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশিষ্ট একটি হোম বাটন। তবে ফিজিক্যাল হোম বাটন থাকলেও স্মার্টফোনটিতে কোন ক্যাপাসিটিভ ন্যাভিগেশন কী ব্যবহার করা হয়নি।  

ডিসপ্লে

৫.৫ ইঞ্চি আকারের ডিসপ্লে প্যানেলে ফুল এইচডি রেজ্যুলেশন ব্যবহার করা হলে সেটা ভালো হতে বাধ্য! এই ডিভাইসটির ক্ষেত্রেও এটি একদম ব্যতিক্রম হয়নি। আইপিএস ডিসপ্লে প্রযুক্তি, চমৎকার রেজ্যুলেশন, ২.৫ডি কর্ণিং গরিলা গ্লাস প্রযুক্তি এবং অসাধারণ কালার রি-প্রোডাকশন– এগুলো সব মিলিয়ে যেন অপো এফ৩ স্মার্টফোনটির একটি চমৎকার বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডিসপ্লে প্যানেলটি। ৫ আঙ্গুল পর্যন্ত মাল্টি টাচ সাপোর্টেড এই ফোনটির টাচ রেসপন্সও আমার কাছে যথেষ্ট ভালো মনে হয়েছে।

ক্যামেরা

অপো এফ৩ স্মার্টফোনটির মূল আকর্ষণ হচ্ছে  সেলফি এক্সপার্ট ডুয়াল ফ্রন্ট ক্যামেরা। যার মধ্যে সেলফি তোলার জন্য একটি ১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা ও গ্রুপ সেলফি তোলার জন্য একটি ওয়াইড এ্যাঙ্গেল ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। ডাবল ভিউ গ্রুপ সেলফি ক্যামেরায় সাধারণ যেকোনো সেলফি ক্যামেরার চেয়ে আছে দ্বিগুণ ভিউ এবং আরও বৃহত্তর ‘ফিল্ড-অব-ভিউ’। এর উন্নত মানের ৬পি লেন্স দেবে প্রফেশনাল ইমেজ কোয়ালিটি এবং খুব সামান্য ইমেজ ডিস্টোর্শন যার ফলে আপনার গ্রুপ সেলফিটি হবে একদম পারফেক্ট।  

এছাড়াও সেলফির জন্য আছে ১৬ মেগাপিক্সেলের আরেকটি ফ্রন্ট ক্যামেরা যার সেন্সর ১/৩ ইি  এবং অ্যাপার্চার এফ/২.০। এই ক্যামেরায় আছে হাই ডাইনামিক রেঞ্জ এবং এতে তোলা ছবিগুলোতে থাকবে খুবই স্বল্প নয়েজ। বিগত সময়ের এফ১এস-এর তুলনায় অপো এফ৩-এর ক্যামেরা আরও উন্নত মানের এবং অপ্টিমাইজড। অনেক উজ্জ্বল অবস্থায়ও সেলফিগুলো ওভারএক্সপোস্ড হবে না এবং থাকবে ঝকঝকে। কম আলোতে সেলফি তুললেও সেগুলো হবে আরও উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট, থাকবে খুব অল্প নয়েজ। এর বিল্ট-ইন স্মার্ট ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরার ফ্রেমে তিনজনের বেশি মানুষ থাকলেই আপনাকে পরামর্শ দেবে ‘গ্রুপ সেলফি মোড’-এ সুইচ করতে। ব্যবহারকারীরা এখন ইমেজ কোয়ালিটির ক্ষেত্রে সমঝোতা না করে এক হাতেই তুলতে পারবেন স্টেবল এবং ঝকঝকে সেলফি।

অপো এফ৩-তে আরও আছে একটি ক্যামেরা সনির কাস্টমাইজ করা আইএমএক্স ৩৯৮ সেন্সরের ১৩ মেগাপিক্সেল, ১/৩ ইঞ্চি সেন্সরের একটি রিয়ার ক্যামেরা। আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে এটি চমৎকারভাবে রাত্রেও ছবি তুলতে পারে। এর পিডিএএফ টেকনোলজি এই ক্যামেরার কর্মক্ষমতাকে করেছে তীক্ষ্ণ এবং দ্রুতগামী বা চলন্ত সাবজেক্টের ছবি তোলা এখন হয়েছে একদম সহজ। গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্তগুলোকে ক্যামেরাবদ্ধ করা এমন সহজ আগে কখনও ছিল না।

‘পাইওনিয়ারিং বিউটিফিকেশন এডিটিং সফটওয়্যার, বিউটিফাই ৪.০’, একই সাথে এফ৩-এর দুটি ফ্রন্ট ক্যামেরা ও রিয়ার ক্যামেরার মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য। ইউজাররা যাতে বিভিন্ন বিউটিফিকেশন মোড ও এফেক্টস্-এর মাধ্যমে সবচাইতে চমৎকার ছবি তুলতে পারেন এই ফিচারটি সেটাই নিশ্চিত করে। এছাড়াও আপনার সেলফি তোলার অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করার জন্য এফ৩-তে রয়েছে পাম শাটার। আপনি ফোনটি হাতে ধরে রাখাকালীন ফোনের স্ক্রীনের ওপর হাত নাড়ালেই নিজ থেকে সেলফি কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যাবে এবং আপনার সেলফি হবে শেক-ফ্রি।

সফটওয়্যার

স্মার্টফোনটিতে অ্যান্ড্রয়েড মার্শম্যালো ব্যবহার করা হয়েছে, তবে নোগাটে আপডেট করা যাবে কিনা এই বিষয়ে তারা এখনও কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। ধারণা করা হচ্ছে এফ ৩ যেহেতু একটি ফ্ল্যাগশীপ ডিভাইস, তাই এটি নোগাট সংস্করণে আপডেট করা যাবে। স্মার্টফোনটির ইউআইটিতে কোন অ্যাপ ড্রয়ার ব্যবহার করা হয়নি, বরং বাড়তি হোম স্ক্রিনেই অ্যাপলিকেশনগুলো অর্গানাইজ করে রাখতে পারবেন ব্যবহারকারীরা। 

হার্ডওয়্যার ও পারফরমেন্স

অপো এফ ৩ স্মার্টফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১.৫ গিগাহার্জ গতির মিদিয়াটেক এমটি ৬৭৫০টিঅক্টা-কোর কর্টেক্স-এ৫৩ কোয়ালকম প্রসেসর। সাথে থাকছে মালি টি৮৬০ এমপিটু জিপিইউ এবং ৪ গিগাবাইট র‍্যাম, যার মধ্যে ব্যবহারকারীরা প্রায় ২.৯ গিগাবাইটের মত ইউজার অ্যাভেইল্যাবল র‍্যাম পাবেন। স্মার্টফোনটির ইন্টারনাল স্টোরেজ বেশ ভালো, ৬৪ গিগাবাইট থাকলেও ১৩.১২ গিগাবাইট থাকছে সিস্টেমের দখলে! তাই একজন ব্যবহারকারী ৫০.৮৮ জিবি স্টোরেজ ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন।

স্মার্টফোনটিতে থাকছে বাড়তি মেমরি কার্ড ব্যবহারের সুবিধা, যা ১২৮ জিবি পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া যাবে!  ৪ গিগাবাইট র‍্যাম ও অক্টা-কোর প্রসেসরের কল্যাণে মাল্টিটাস্কিং-এর ক্ষেত্রে কোন ঝামেলায় পরতে হয়নি আমাকে। বড় গেমের হাই গ্রাফিক্স সেটিংস ছাড়া অন্য কোন অপারেশনেই আমাকে ল্যাগ ফেস করতে হয়নি যা আমাকে অবাক করেছে। এক কথায়, এর পারফরমেন্স নিয়ে আমি সন্তুষ্ট!

বেঞ্চমার্ক

স্মার্টফোনটির বেঞ্চমার্ক পরীক্ষার ফলাফল আমার কাছে কিছুটা মিশ্র মনে হয়েছে। আনটুটুতে এটি স্কোর করেছে ৫৩৩৪৫ যা ভালো মনে হয়েছে, তবে বিশেষ কিছু না। কারণ, ৪ গিগাবাইট ডিডিআর৩ র‍্যাম থেকে এটুকু আশা করাই যায়। নেনামার্ক ২  গিকবেঞ্চ ৪-এ ও মোটামুটি ভালোই স্কোর করতে সক্ষম হয়েছে স্মার্টফোনটি। নেনামার্কে ডিভাইসটির স্কোর ছিলো ৬০.৫ এফপিএস, গিকবেঞ্চে এর সিঙ্গেল কোর ও মাল্টি কোরের পারফর্মেন্স ছিল যথাক্রমে ৭৬০ ও ২৮০১।

সেন্সর

ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর– স্মার্টফোনটিতে একটি ফিজিক্যাল হোম বাটন রাখা হয়েছে এবং এই হোম বাটনের উপরেই মূলত ডিভাইসটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা বায়োমেট্রিক সেন্সর প্লেস করা হয়েছে। এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সচরাচর সেন্সর থেকে মোটামুটি দ্রুত কাজ করে। আমরা দেখেছি এই সেন্সরটি .০২ সেকেন্ডে কাজ করে, যা অসম্ভব ভালো লাগার একটি বিষয় বলেও আমি মনে করি।

বায়োমেট্রিক সেন্সর ছাড়াও স্মার্টফোনটিতে বেশ কিছু স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিভাইসটিতে আপনি একসেলারোমিটার সেন্সর, লাইট সেন্সর, প্রক্সিমিটি সেন্সর, ডিসটেন্স সেন্সর, জায়রোস্কোপ সেন্সরের দেখা পাবেন আপনি। 

ব্যাটারি লাইফ

স্মার্টফোনটিতে আছে হাই এনার্জি, হাই ডেনসিটির ৩২০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার একটি লি-পলিমার ব্যাটারি যা সাধারণ ব্যবহারে আপনাকে প্রায় আড়াই দিনেরও বেশি ব্যাক-আপ দিতে সক্ষম! জিএসএম এরিনার ফলাফল অনুযায়ী স্মার্টফোনটি প্রায় ২৮৪ ঘন্টার বেশি সময় স্ট্যান্ডবাই থাকতে পারে, এছাড়াও ২৫ ঘণ্টা ০৭ মিনিট ছিল অন কল টাইম। এছাড়াও ৯ ঘন্টা ৪১ মিনিট ওয়েব ব্রাউজিং এবং ৮ ঘন্টা ৫৮ মিনিট ভিডিও প্লে করা গেছে।

বুঝতেই পারছেন, বেসিক কিংবা অ্যাডভান্স, যে ধরণের ব্যবহারকারীই আপনি হন না কেন এই স্মার্টফোনটি ব্যবহারের সময় ব্যাটারি ব্যাক-আপ নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হবেনা আপনাকে। এছাড়াও রয়েছে ‘ইকো’ মোড যা একটি সিম্পল ইন্টারফেস ক্রিয়েট করে ব্যাটারি সংরক্ষণে সহায়তা করবে। পাশাপাশি মার্শম্যালোর ডোজ ফিচারটিতো থাকছেই।

বর্তমানে দেশের বাজারে  গোল্ড, রোজ গোল্ড ও ব্ল্যাক কালারে অপো এফ৩ পাওয়া যাবে ২৫ হাজার ৯৯০ টাকা মূল্যে।

প্রিয় টেক/মিজান