ছবি প্রথম আলো

(প্রিয়.কম) চট্টগ্রাম জেলার একমাত্র প্রাকৃতিক ও সংরক্ষিত বন রামগড়-সীতাকুণ্ড বনভূমির মধ্য দিয়ে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। এতে ৬৩ হেক্টর বনভূমির বৃক্ষ কাটা পড়বে। ওই বনের মধ্যে রয়েছে দেশের প্রায় বিলুপ্ত হওয়া সবচেয়ে দীর্ঘতম বৃক্ষ।

২১ মার্চ মঙ্গলবার ‘সংরক্ষিত বন ভাগ করে বিদ্যুৎ লাইন’ শীর্ষক শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বন বিভাগ শুধু বৃক্ষসম্পদের যে আর্থিক মূল্য হিসাব করেছে, তার পরিমাণ ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এই বনভূমির আয়তন প্রায় ৭২ বর্গকিলোমিটার।

সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি ‘মাতারবাড়ী-মদনাঘাট-মেঘনাঘাট ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন’ নামের এই প্রকল্পের আওতায় ওই লাইন নির্মিত হতে যাচ্ছে। বন বিভাগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সংরক্ষিত বনের মধ্যে এই বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন। তাঁরা বনের বাইরে দিয়ে এই লাইন নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ওই সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কারণে যে পরিমাণ গাছ কাটা পড়বে, তার চেয়ে বেশি গাছ তারা অন্যত্র রোপণ করবে। এই পরিস্থিতিতে আজ ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস পালিত হচ্ছে।

সীতাকুণ্ডের ওই বনভূমির ওপর প্রায় এক যুগ ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক কামাল হোসেন। তিনি বন বিভাগের পক্ষ থেকে ওই বন সংরক্ষণের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, ‘ওই বনভূমিতে অনেক দুর্লভ বৃক্ষ ও বন্য প্রাণী আছে, যা আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না। সেখানে বেশ কিছু চমৎকার ঝরনা ও পাহাড়ি বন আছে, যা বাংলাদেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বনের মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মিত হলে বনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে বন দখল করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করত। এখন আর তা পারে না। তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কোনো সরকারি সংস্থা উন্নয়নকাজের জন্য বনের জমি চাইলে আমরা প্রচলিত নিয়ম মেনে সহযোগিতা করে থাকি।’

গত নভেম্বরে সরকারকে দেওয়া ওই কমিটির সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ফলে ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বৃক্ষসম্পদের ক্ষতি হবে। তবে এ ধরনের বনের ক্ষতির যথার্থ হিসাব করার মতো কোনো পদ্ধতি এখনো দেশে নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আরও বলা হয়, ১৩ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সঞ্চালন লাইন নির্মিত হলে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ৪১ দশমিক ৪ হেক্টর বন ও বনশিল্প করপোরেশনের আওতাধীন ২১ দশমিক ৬ হেক্টর রাবার বন কাটা পড়বে।

কমিটির হিসাব অনুযায়ী ওই ৬৩ হেক্টর বনভূমিতে প্রায় ২ হাজার চারা গাছ, ১২১টি বাঁশঝাড়, প্রায় দেড় হাজার বল্লী এবং ২২৭টি বিপন্নপ্রায় বন্য প্রাণী রয়েছে।

এ ব্যাপারে ওই কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জগলুল হোসেন  বলেন, ‘আমরা দেশের প্রচলিত বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী ওই বনভূমি সংরক্ষণ করার গুরুত্ব উল্লেখ করে সরকারকে জানিয়েছি। এখন বাকি সিদ্ধান্ত কী হবে, সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলতে পারব না।’

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কোয়াস  বলেন, ‘আমরা যে পরিমাণ গাছ কাটব, তার চেয়ে বেশি গাছ অন্য জায়গায় রোপণ করে দেব। প্রয়োজনে বন বিভাগকে ক্ষতিপূরণ দেব।’

অবশ্য এমন সংরক্ষিত বনের সম্পদকে আর্থিক মূল্যে নিরূপণ করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব বনের এমন অনেক সম্পদ আছে, যা এখনো দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা জানতেই পারেননি। ফলে যেকোনো বনভূমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের আগে এর জীববৈচিত্র্য ও অন্যান্য সম্পদের একটি সঠিক সমীক্ষা করা দরকার। কিসের বিনিময়ে আমরা কী পাচ্ছি, তা হিসাব করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

প্রিয় সংবাদ/রুবেল/খোরশেদ