ধোঁয়ায় মিশে যাচ্ছে ধূমপান আইন

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশোধনী আনা হয়েছিল ২০১৩-তে।

ইফতেখার শুভ
প্রতিবেদক
১৩ জানুয়ারি ২০১৮, সময় - ০৮:২৫

প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) গণপরিবহন, পার্ক, সরকারি-বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, রেস্তোরাঁ, শপিং মল, পাবলিক টয়লেটসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ধূমপান বন্ধে ২০০৫ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল একটি আইন। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার রোধে করা সেই আইনে প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা ধরা হয়েছিল ৫০ টাকা। শুরুর দিকে সেই অর্থ জরিমানা করতে পুলিশ কিছু অভিযানও চালিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আইন অমান্য করে খোদ পুলিশের বহু সদস্যই প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। এর সুযোগ নেয় জনগণও। এভাবে পুলিশ-জনতার দায়িত্বহীনতায় কেতাবি বিষয়ে পরিণত হয় ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশোধনী আনা হয়েছিল ২০১৩-তে। সেই সংশোধনীতে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের সাজার অর্থ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। কিন্তু আইন না জানা ও ভাঙায় অভ্যস্ত লোকজনের অবস্থা তাতে বদলায়নি এতটুকু।

সারা দেশের প্রায় সব জায়গাতেই প্রকাশ্যে জনসমাগমস্থলে ধূমপান স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল জনসংখ্যার শহর ঢাকায় এই বিষয়টি যেন মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত রাজধানীর লোকাল বাসগুলোতে চলাচলকারী যাত্রীরা প্রতিনিয়ত নীরবে সহ্য করেন সিগারেটের ধোঁয়ার অকারণ জ্বালাতন।

অধিকাংশ যানবাহনের চালকই গাড়ি চলন্ত অবস্থায় ধূমপান করেন। সিগারেটের সেই ধোঁয়ায় বেশির ভাগ সময়ই বিপাকে পড়েন তাদের পাশে সংরক্ষিত আসনে বসে থাকা নারী যাত্রীরা।

রাজধানীর ফার্মগেটে সিগন্যালে বসে সিগারেট সেবন করছিলেন চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিলে চলাচলকারী নিউ ভিশন পরিবহনের বাসচালক মো. জসিম। তার পাশের সিটে বসা এক নারী যাত্রী হাত নেড়ে ধোঁয়া সরানোর চেষ্টা করছিলেন।

ওই সময় এই প্রতিবেদক জসিমের উদ্দেশে বলেন, ‘গাড়িতে বসে সিগারেট খাচ্ছেন কেন?’

‘সমস্যা কী? সিগারেটের ধোঁয়া তো বাইরে ছাড়ছি। কারও সমস্যা হওয়ার তো কথা না। আর আমি সব সময় তো চালানো সময় সিগারেট খাই। মাথা ঠিক থাকে’, উত্তরে বলেন জসিম।

উত্তর শুনে প্রতিবেদক বাসচালককে জনসমাগমস্থলে কিংবা বাসে ধূমপান করলে জরিমানার বিষয়টি জানান। এ সময় বিস্ময় প্রকাশ করে বাসচালক জানান, এ ধরনের কোনো আইনের কথা তিনি জানেন না।

ধূমপান না করার নোটিশ থাকার পরও অনেক রেস্তোরাঁয় সিগারেট সেবন করেন। এ ক্ষেত্রে বিপাকে পড়তে হয় অধূমপায়ীদের। বাজে অবস্থা যাত্রীবাহী লঞ্চেরও। লঞ্চ ছাড়ার পরই ধূমপান করতে শুরু করেন যাত্রীরা। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না কর্তৃপক্ষকে।

প্রকাশ্যে ধূমপান থেকে বিরত থাকছেন না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। অথচ তাদেরই আইন রক্ষায় সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় প্রিয়.কমকে বলেন, ‘যদি কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় পাবলিক প্লেসে ধূমপান করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তা নীতি এবং আইন বর্হিভূত। আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি যাতে পুলিশ সদস্যরা সব ধরনের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, সে জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে।’

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস স্টপেজ ও বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ধূমপান করতে দেখা যায়। কিন্তু সে বিষয়ে জনসচেতনতার কোনো উদ্যোগ নেই।

রাজধানীতে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম অজিয়র রহমান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমরা পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিপক্ষে অভিযান চালিয়েছি। তবে এ ধরনের মোবাইল কোর্টে একই জায়গা থেকে দুই-একজনের বেশিকে ধরা যায় না। তবুও আমরা অন্য মোবাইল কোর্টের সময় এই বিষয়টির দিকেও নজর রাখি।’

এ ছাড়া পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিষয়ে অধিক প্রচারণা চালনো হচ্ছে বলেও জানান ডিএনসিসির এই ম্যাজিস্ট্রেট। সেই সঙ্গে পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।  

ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইনটি বাস্তবে প্রয়োগের দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নয় বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আসলে ধূমপান মাদকের পর্যায়ে পরে না। তাই এ বিষয়ে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবুও সামনের দিনগুলোতে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিয়ে কিছু করা যায় কি-না, তা দেখা হবে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিইনি।

পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিরুদ্ধে প্রায়ই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানান ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিট্রেট মো. মশিউর রহমান। প্রিয়.কমকে তিনি বলেন, ‘পাবলিক প্লেসে ধূমপানের বিরুদ্ধে অনেক সময়ই মোবাইল কোর্ট চালানো হয়। ঢাকা মহানগরীতে অন্য কোনো মোবাইল কোর্ট চালানোর সময়ও ধূমপানের বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হয়। আর পাবলিক প্লেসে ধূমপানে শাস্তি আগের থেকে বাড়ানো হয়েছে।’ 

কী কারণে পাবলিক প্লেসে ধূমপান কমানো যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে মশিউর রহমান বলেন, ‘আগের থেকে মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বাসে এখন আর কাউকে ধূমপান করতে দেখা যায় না। তবে বাইরে এখনো আইনটি মানা হয় না। শুধু আইন প্রয়োগ করে হবে না, মানুষকেও সচেতন হতে হবে।’

প্রিয় সংবাদ/কেএফ

জনপ্রিয়
আরো পড়ুন