শিমূল ইউসুফ। ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল, প্রিয়.কম। 

(প্রিয়.কম) শিশুশিল্পী হিসেবে মাত্র ৫ বছর বয়সে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাজিমাত করা  শিমূল ইউসুফ আজ জীবন্ত কিংবদন্তী। অভিনয়শিল্পীসঙ্গীতপরিচালককোরিওগ্রাফারপোশাক পরিকল্পনাসহ অসংখ্য মনোমুগ্ধকর কাজের কারিগর তিনি। বাংলা অভিনয়রীতির বিকাশেশুদ্ধ সঙ্গীতচর্চায় অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী। সময়ের ব্যবধানে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে ২১ মার্চ নিজের ষাটতম জন্মদিনকে সামনে রেখে কিছু স্মরণীয় ঘটনা ও জীবন দর্শন নিয়ে প্রিয়.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

প্রিয়.কম: প্রথমেই আপনাকে জন্মদিনের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কেমন আছেন?

শিমূল ইউসুফ: আমি খুবই অসুস্থ। প্রায় তিন মাস হলো ছুটিতে আছি। আরো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। বয়স হয়েছে তো। বার্ধক্যজনিত সব অসুস্থতা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।

প্রিয়.কম: কিন্তু আপনার মন এখনো বেশ তরুণ। আপনার জীবনের শুরুর দিকের গল্পগুলো শুনতে চাই।

শিমূল ইউসুফ: আমরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। দুই ভাই মারা গেছেন। আমার জন্ম ঢাকাতেই। ভাইবোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোট। আমার বাবা মেহতের বিল্লাহ কমলাপুরে গান গাইতেন। তিনি খুব দারুণ গান জানতেন। আমি মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারাই। বাবার খুব একটা স্মৃতি আমার মনে পড়ে না।

প্রিয়.কম: তাহলে পিতৃহীন শৈশব কেটেছিল আপনার...

শিমূল ইউসুফ: জ্বি। বাবা ছাড়া আসলে সন্তানদের যেমন কাটে জীবন, তেমনই কেটেছে। আমার অন্যান্য ভাইবোনেরা বাবাকে পেয়েছে কিন্তু আমি সর্বকনিষ্ঠ হবার কারণে বাবার সাহচর্য খুব একটা পাইনি। কাজেই আমার ছেলেবেলা খুব একটা সুখকর ছিল না।

প্রিয়.কম: পড়াশোনা কোথায় করেছেন?

শিমূল ইউসুফ: আমি সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করি। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করি। মধ্যখানে আর্ট কলেজে পড়েছি দুই বছর।

প্রিয়.কম: খুব অল্প বয়স থেকেই তো আপনি গানের জগতে পদার্পণ করেছেন। সেই সময়গুলোর কথা জানতে চাই।

শিমূল ইউসুফ: আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন থেকে গান শুরু করি। রেডিও ও টেলিভিশনে গান করতাম। কচি কাঁচার মেলা নামক শিশুদের একটি গানের অনুষ্ঠানেও আমি গান গেয়েছিলাম। ১৯৬২ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চে অভিনয় ও সঙ্গীতজীবন শুরু করি। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের সম্প্রচারের প্রথম দিন শিশুশিল্পী হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলাম।

শিমূল ইউসুফ। ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল, প্রিয়.কম। 

প্রিয়.কম: সেই সময় গানের তালিম নিতেন কার কাছে?

শিমূল ইউসুফ: আমি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ওস্তাদ হেলাল উদ্দিন, পিসি গোমেজ, আলতাফ মাহমুদ এবং আব্দুল লতিফ এর কাছ থেকে শাস্ত্রীয় এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত গানের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। 

প্রিয়.কম: আপনার গানের অ্যালবাম বের হয়েছে কী?

শিমূল ইউসুফ: গণসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত এবং লালনের গান নিয়ে আমার ৫টি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। 

প্রিয়.কম: এবার একটু গল্প করা যাক থিয়েটার বিষয়ে।

শিমূল ইউসুফ: বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৪ সালে আমি ঢাকা থিয়েটারে যোগদান করি। এ পর্যন্ত ঢাকা থিয়েটারের ৩৪টি নাটকে অভিনয়শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক, কোরিওগ্রাফার এবং পোশাক পরিকল্পনা, সহযোগী নির্দেশক ও পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজ করেছি।

প্রিয়.কম: মঞ্চনাটক না গান, কোন বিষয়ে আপনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

শিমূল ইউসুফ: দুটোই যেহেতু শিল্প, তাই আলাদা করে বলবার কিছু নেই। মঞ্চনাটক ও গান দুটো ব্যাপারই আমার আত্মার খুব নিকটবর্তী। আমি রেডিও, টেলিভিশন ও মঞ্চের শিল্পী বলেই নিজেকে আখ্যা দিই। ১৯৭৪ সালে ঢাকা থিয়েটারে যোগদানের পর থেকে পুরোপুরিভাবে নিজেকে মঞ্চে নিয়োজিত করি। পাশাপাশি শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চা অব্যাহত রেখেছিলাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের জীবনে আমি প্রায় দুই সহস্রাধিক নজরুল সঙ্গীত, গণসঙ্গীত- রেডিও, টেলিভিশন ও মঞ্চে পরিবেশন করেছি এবং মঞ্চের ৩৩টি নাটকের ষোল শতাধিক মঞ্চায়নে অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছি। সবকিছুই দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

প্রিয়.কম: উল্লেখযোগ্য ও প্রিয় কিছু নাটকের বলুন?

শিমূল ইউসুফ: আমার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ও প্রিয় নাটকের মধ্যে রয়েছে মুনতাসীর, কসাই, চর কাঁকড়া, শকুন্তলা, ফণীমনসা, কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, হাতহদাই, চাকা, একাত্তরের পালা, যৈবতীকন্যার মন, মার্চেন্ট অব ভেনিস, বনপাংশুল, প্রাচ্য, বিনোদিনী, ধাবমান, নষ্টনীড়, দ্য টেম্পেস্ট সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আমার একক অভিনয়ের নাটক বিনোদিনী বিশ্বনাট্য অলিম্পিকস ও আন্তর্জাতিক মনোড্রামা উৎসবে মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

(একটু হেসে) রুবাইয়াআহমেদের অনুবাদ রূপান্তরে এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনায় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত শেক্সপিয়রস গ্লোব থিয়েটারে মঞ্চায়িত বাংলা ভাষার প্রথম নাটক দ্য টেম্পেস্ট প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে কিন্তু আমিই অভিনয় করেছিলাম।

শিমূল ইউসুফ। ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল, প্রিয়.কম। 

প্রিয়.কম: থিয়েটারে অভিনয় করার ব্যাপারটি প্রথম দিকে আপনার পরিবারে কীভাবে নিয়েছিল?

শিমূল ইউসুফ: আমি তো একদম ছোট্টবেলা থেকেই গান করি। আমার মায়ের খুব প্রিয় ছিল আমার কণ্ঠ। তিনি আজীবন চেয়েছেন যেন আমি গান গেয়ে যাই। কিন্তু থিয়েটারে অভিনয়ের জন্যেও কখনো নিন্দিত হইনি আমি। এটা আমার কাছে একটি নেশার মতো ছিল। 

প্রিয়.কম: থিয়েটারের কোন দিকটা আপনাকে অধিক আকৃষ্ট করে?

শিমূল ইউসুফ: নিয়মানুবর্তিতা, একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি, সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক, বড়দের সম্মান করা ও ছোটদের স্নেহ দেয়া, কাজ শেখা এসব দিক আমাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করে। আমি মনে করি কেউ যদি সত্যিকারের জীবন যাপন করতে চায় তবে তাকে জীবনে একবারের জন্য হলেও মঞ্চনাটকের সাথে জড়িত হওয়া উচিত।

প্রিয়.কম: জীবনের এ পর্যায়ে এসে কোন জীবন-দর্শনে বিশ্বাসী আপনি?

শিমূল ইউসুফ: ভালো প্রশ্ন। আমি মনে করি একজন মানুষকে আগাগোড়াই সৎ হতে হবে। কোনোভাবেই মিথ্যা ও অসাধুতার আশ্রয় নেয়া যাবে না। আমি খুব অনাড়ম্বরভাবে চলাফেরাতে বিশ্বাসী, এমনভাবে চলছি আজীবন যেন কখনো কারো কাছে হাত পাততে না হয়।

প্রিয়.কম: দীর্ঘ কর্মজীবনে আপনি অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কোনগুলো আপনার কাছে?

শিমূল ইউসুফ: (মুচকি হেসে) আমি আসলেই অনেক পুরস্কারেই ভূষিত হয়েছি। তবে আমার কাছে যেটি সবচেয়ে বেশি মূল্যবান, সেটি হলো মানুষের ভালোবাসা। আমি আমার বন্ধু, আত্মীয়, শুভাকাঙ্ক্ষী সবার কাছেই অনেক কৃতজ্ঞ। তবে আলাদা করে যদি বলতে হয় তার মধ্যে আমার কাছে উল্লেখযোগ্য হলো;১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের শিশুশিল্পী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদক, লোকনাট্যদল পদক, বাচসাস পদক, মোহাম্মদ জাকারিয়া পদককালচারাল রিপোর্টার্স ইউনিটি পদক, মানবজমিন পাঠকজরিপসহ কচিকাঁচা মেলার আজীবন সম্মাননাতেও ভূষিত হয়েছিবাঙলা অভিনয়রীতি বিকাশে এবং শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চায় অবদানের জন্য আমি কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন কর্তৃক মঞ্চকুসুম উপাধিতেও ভূষিত হয়েছি। এটিও আমার কাছে বেশ স্মরণীয়।

প্রিয়.কম: এই মুহূর্তে কোন মানুষগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে? কাদের কাছে আপনি নিজেকে ঋণী মনে করেন?

শিমূল ইউসুফ: আমি বাবাকে যতটুকু জেনেছি চার বছর পর্যন্ত, তার মধ্যে তাঁকেই সবচেয়ে বেশি মনে করি। বাবার কাছে আমার অনেক ঋণ। মায়ের ক্ষেত্রেও একই বিচার। এছাড়া এই তালিকায় আছেন আলতাফ মাহমুদ, সেলিম আল দীন ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। আমি আজকের শিমুল ইউসুফে পরিণত হয়েছি তাদের জন্যেই।

প্রিয়.কম: আপনার বাবার ব্যাপারে খুব জানতে ইচ্ছা করছে।

শিমূল ইউসুফ: আমার বাবা সুফীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। দারুণ গান গাইতে পারতেন তিনি। শেষের দিকে বাবার জীবনটা একদম বদলে যায়। বাবা সারারাত নামাজ পড়তেন। সকালে ফজরের নামাজ পড়ার পর আমাদের কানের কাছে মোনাজাত করতেন। আনন্দে ভরে যেত মনটা। এগুলোই মনে আছে বাবার ব্যাপারে।

প্রিয়.কম: আপনার অবসর সময়ের বিষয়ে জানতে চাই। কী করা হয় তখন?

শিমূল ইউসুফ: (মিষ্টি হেসে) এখন আমার অখন্ড অবসর। আমি সারাদিন বই পড়ি, গান শুনি। এতে করে নিজেকে খুব হাল্কা লাগে। শান্তি খুঁজে পাই। সাম্প্রতিককালে আমি দুটো বই পড়েছি। সেগুলো হলো শাহাদাত হোসেনের আরশীনগর ও মানবজনম।

শিমুল ইউসুফ। ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল, প্রিয়.কম। 

প্রিয়.কম: বই পড়তে কেমন লাগে?

শিমূল ইউসুফ: সে আর বলতে হয়? বই পড়তে অসাধারণ লাগে আমার। আমার জ্ঞানের মূলে তো বই আর বই। সারাদিন অনেক পড়াশোনা করি। নিজেকে নতুন করে জানার সুযোগ পাই, বুঝতে পারি। আমার ভিতই হলো পড়া ও সঙ্গীত।

প্রিয়.কম: যাচ্ছি জন্মদিন প্রসঙ্গে। ছোটবেলার কোনো মজার ঘটনা মনে পড়ে কী?

শিমূল ইউসুফ: একদম নস্টালজিক করে দিলেন আপনি। মা পায়েস রাঁধতেন। খুব যদি সম্ভব হতো, রাতে পোলাও-গোসত রান্না হতো। এখনো মনে হয় সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এক দৌড়ে শৈশবে ফিরে যেতে মন চায়। বুড়িয়ে গেছি এখন, আগের মতো করে আর জন্মদিন পালন করা হয় না।

প্রিয়.কম: আপনার মুখে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা জানতে চাই। কেমন ছিল সময়গুলো?

শিমূল ইউসুফ: স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমি মাত্র চৌদ্দ বছরের কিশোরী ছিলাম। যুদ্ধের বীভৎসতা আমি একদম কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার সারাজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো এটি। তখন আমরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের একদম উল্টো দিকে থাকতামরাতের পর রাত নিরীহ মা-বোনদের উপর যে পরিমাণ অত্যাচার চালানো হতো সব আমরা শুনতে পেতাম। ভয়ে গুটিসুটি মেরে থাকতাম।

প্রিয়.কম: আপনার বাবা ছিলেন না তখন। কোনো অভিভাবক ছিল কী? দিনাতিপাত করতেন কীভাবে? 

শিমূল ইউসুফ: আমার পাঁচ ভাই ছিলেন অভিভাবক হিসেবে। এছাড়া শহীদ আলতাফ মাহমুদ ছায়া হয়ে ছিলেন আমাদের সাথে। আমি যে পিতৃহারা ছিলাম সেটা তারা কখনো বুঝতে দেননি। কাজেই সেই অভাবটি কখনো অনুভূত হতো না। আমরা ঘরে কোনোরকম আলো জ্বালাতে পারতাম না। ছোট ছোট বাতি জ্বালালেও চারপাশে কাগজের আবরণ দিয়ে রাখতে হতো যেন আলো ছড়িয়ে না পড়ে। আলো দেখলেই হানাদার বাহিনী গুলি চালানো শুরু করতো। একদম কারফিউ এর মতো অবস্থা ছিল। সত্যি কথা বলতে ঐ সময়টা যারা দেখেননি তাদের পক্ষে বিষয়টি ধারণা করাও সম্ভব না।

প্রিয়.কম: আপনাকে আবারো অনেক শুভকামনা জন্মদিনের। আশা করছি আপনি খুব শিগগির আপনার ভালোবাসার জায়গা, মঞ্চনাটকে ফিরতে পারবেন।

শিমূল ইউসুফপ্রিয়.কমকেও অনেক ধন্যবাদ ও শুভকামনা।

সম্পাদনা: ফারজানা রিংকী/গোরা