(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সেনা নির্যাতনের ২৬ তম দিনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি। বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা ছিল সংকট নিরসনে তিনি এমন কিছু বলবেন, নিদেশনা দেবেন যাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি সুচির অবস্থান স্পষ্ট হয়, নিরসন হয় রোহিঙ্গা রক্তের স্রোত। কিন্তু নির্জলা মিথ্যা দিয়ে বিশ্বের শান্তিকামী কোটি কোটি মানুষকে তিনি হতাশ করেছেন।

সুচির ভাষণের অনেক কথাই মনগড়া ও সত্য নয়, সে দাবি করেছেন বিবিসির দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জনাথন হেড। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকেই তিনি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুই দিকের রোহিঙ্গাদেরই দুর্ভোগ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরছেন। সুচির মিথ্যা বক্তব্যের বিষয়ে জনাথন হেড বর্ণনাও করেছেন।

৭ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে আগুন দেখতে পান জনাথন। ছবি: বিবিসি

৭ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে আগুন দেখতে পান জনাথন। ছবি: বিবিসি 

সু চি তার দেওয়া ভাষণে দাবি করেছেন, ‘৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ক্লিয়ারেন্স অপারোশনও বন্ধ রয়েছে’। এ বক্তব্যের জবাবে জনাথন হেড বলেন, রাখাইন পরিস্থিতি দেখতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে একটি গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের ৭ সেপ্টেম্বর আমি রাখাইনের আলেল থান কাউয়ে গিয়েছিলাম। ওই সফরে আমরা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির শব্দ পেয়েছি। এছাড়া ওই এলাকার চারটি জায়গা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখেছি। সফর শেষে বাংলাদেশে আসার পরও নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশ থেকে ধোঁয়া দেখতে পেয়েছি। এটিই প্রমাণ করে গ্রামগুলোতে আগুন দেওয়া হয়েছে। 

রোহিঙ্গা কিলিং মিশনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে জ্বলছে রোহিঙ্গা গ্রাম। ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছবিটি ফোকাস বাংলার তোলা

রোহিঙ্গা কিলিং মিশনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে জ্বলছে রোহিঙ্গা গ্রাম। ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছবিটি ফোকাস বাংলার তোলা

সু চি তার ভাষেণে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, তাদের ধর্ম, বর্ণ বা যে রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। এই বক্তব্যবের যুক্তি খন্ডন করে জনাথন হেড বলেন, মিয়ানমারের ৭০ বছরের সেনা শাসনের ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই যে, রাখাইনে মোতায়েন সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের সাথে মানবিক আচরণ করেছে। বর্তমান অভিযান শুরু পর ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্ম’ নয় বরং সেনা বাহিনীর অত্যাচারে বাধ্য হয়ে চার লাখের বেশি মানুষ মিয়ানমার ছেড়ে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে।

প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবিটি ৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া সীমান্ত থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবিটি ৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া সীমান্ত থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা 

এছাড়া মংডুতে অবস্থান করার সময়ে এক কর্নেল আমায় বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সত্য নয়’। এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বাহিনী রোহিঙ্গা বিদ্রোহী দমন করতেই খুব ব্যস্ত। তাছাড়া রোহিঙ্গা নারীরা দেখতে মোটেও সুন্দরী নয়।

সু চি তার ভাষণে আরও বলেছেন, ‘কোনো ধরনের বৈষম্য নয়, রাখাইনে বসবাসকারী সকলেই সমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ পায় ’। সু চির এই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে জনাথন বলেন, সু চির এই বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যা। বহুদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের চলাফেরার কোনো স্বাধীনতা নেই। নিজ এলাকা ব্যতীত অন্য এলাকায় বিয়ে করতে গেলেও কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় সেজন্য দিতে হয় মোটা অংকের ঘুষ। ২০১২ সালে সহিংসতার পরে এই বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা হয়েছে। অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারের সদস্যরা বিশেষ অনুমতি ছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রের বাইরেও যেতে পারেন না। এছাড়া ওই আশ্রয়কেন্দ্রের শিশুদের পড়াশোনা প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জনাথন হেড। ছবি: সংগৃহীত

 

বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জনাথন হেড। ছবি: সংগৃহীত

জনাথন বলেন, চার বছর আগে আমি রাথেডাংয়ে একটি গ্রাম পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানকার রোহিঙ্গারা চিকিৎসার জন্যও বাইরে যেতে পারেন না। সেখানে তারা স্থানীয় বৌদ্ধদের দ্বারাই পরিবেষ্টিত। গত সোমবার আমার সাথে আবদুল মজিদ নামে একজনের সাথে দেখা হয়েছে যিনি দু থার ইয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছর জরুরি কাজেও তিনি তার গ্রামের বাইরে কোথাও যেতে পারেননি।

নতুন করে গত ১১ আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েনের পর ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ‘জাতিগত নিধন’ শুরু হয়। ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। পুরানো পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার সাথে নতুন অভিযানে ইতোমধ্যে যোগ হয়েছে আরও চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা। সারা বিশ্বে ইউএনএইচসিআর কতৃক নিবন্ধিত ১৭.২ মিলিয়ন শরণার্থীর ৩০% এখন বাংলাদেশে। এরই মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা ঢল অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এত সংখ্যক শরণার্থীর দায়িত্ব তাদের পক্ষেও নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। 

এই প্রেক্ষাপটে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের অপেক্ষায় ছিল পুরো বিশ্ব। কিন্তু ভাষণে সু চি দাবি করেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অভিযান চালানো হয়নি। অধিকাংশ রাখাইন গ্রাম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে যেসব খবর অন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে, সেটিও অস্বীকার করেছেন তিনি।

প্রিয় সংবাদ/রিমন