ছবি সংগৃহীত

এখন আমি খুব একটা গানের খোঁজ খবর রাখি না: হায়দার হোসেন

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যতিক্রমধর্মী গান করার কারণেই শিল্পী হায়দার হোসেন শ্রোতাদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। এদিকে ১৪ মার্চ সকালে সঙ্গীত জীবন, বর্তমান ব্যস্ততাসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি-

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০১৭, ১৬:০৬ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২২:১৬
প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০১৭, ১৬:০৬ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২২:১৬


ছবি সংগৃহীত

হায়দার হোসেন/ ছবি: রিয়াজ আহমেদ

(প্রিয়.কম) তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যতিক্রমী গান করার কারণেই শিল্পী হায়দার হোসেন শ্রোতাদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। গানে গানে তিনি তুলে ধরেন আমাদের জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে স্বকীয়তার জন্য আরও বেশি আলোচনায় ছিলেন সব সময়। এদিকে ১৪ মার্চ সকালে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় প্রিয়.কমের সঙ্গে সঙ্গীত জীবন, বর্তমান ব্যস্ততাসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি-

প্রিয়.কম: আপনি তো এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেছেন-এরপর বেশ খানিকটা সময় এ ধরনের পেশার সঙ্গে যুক্তও ছিলেন। সেখান থেকে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেন। এরপর গানের সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?

হায়দার হোসেন: মিউজিক পেশায় আছি ১৯৭৯ সাল থেকে। আমি তো একজন প্লে-ব্যাক মিউজিশিয়ান। মানে আমি গিটার বাজাতাম। বেশিরভাগ সময় ফিল্মের গানে বাজাতাম। আমি তখন কাজ করতাম বিখ্যাত সুরকার আলম খানের সঙ্গে। এরপর বাজাতাম পপগুরু আজম খানের সঙ্গে। উইনিংসের ফাউন্ডার মেম্বারও আমি। নামগুলোও আমার দেওয়া। গানের পাশাপাশি লেখাপড়া করতাম। আমি যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছি এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ারিং এ। এরমধ্যে কিছু সময় আমি বিমানেও কাজ করেছি। মানে লেখাপড়া একদিকে গানবাজনা আরেকদিকে।

প্রিয়.কম: আচ্ছা, গান গাওয়ার তাগিদটা কীভাবে আপনার মধ্যে আসল?

হায়দার হোসেন: গান গাওয়ার কোন তাগিদ ছিল না। আমি গান কম্পোজিশন করতাম। গান অপরকে দিয়ে গাওয়াতাম। আমাদের বাংলাদেশে বড় একটা বিষয় কি-বড় বড় মিউজিশিয়ানদেরকে কেউ চিনেন না। যারা গায় তারাদেরকে সবাই চিনেন। আর মিউজিশিয়ানরা হচ্ছেন-পর্দার পেছনের মানুষদের মতো। আমার গান গাওয়ার কখনোই ইচ্ছে ছিল না। আমি যে গান ১৯৮১ সালে করেছি। সে গান এখনও জনপ্রিয়। আমি যখন নতুন করে ১৯৯২ কিংবা ৯৩ সালে বাংলাদেশে আসলাম তখন থেকে ক্যাজুয়াল গান করি।

গান করতে হবে, গান আমার পেশা হবে বিষয়টা এমন না! আসার পর তখন খুব একটা গিটারও বাজাতাম না। সাবাত আলী নামে একজন গায়িকা ছিলেন। তিনি আমার খুব ভালো বন্ধুও। একদিন তিনি আমার বাসায় এসে বললেন হায়দার ভাই আপনি আমাকে একটা গান করে দেন। আমি বললাম-আমি তো এখন আর গান করি না। সে কি করলো, একটা গিটার কিনে আমার বাসায় রেখে গেলো। তারপর আবার গিটার বাজানো শুরু হলো...।

এরপর আবার গান লেখা শুরু করলাম। ২০০৪ সালের ঘটনা-আমি গান লিখি কয়েকজনকে গাওয়ানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু দেখলাম কেউ আমার গানগুলো গাওয়ার জন্য আগ্রহী না। বছর খানেকের মতো বসেও ছিলাম। এরপর সাবাত বললো-কাউকে দিয়ে গাওয়ানোর দরকার নাই। আপনি নিজে গেয়ে ফেলেন। আমি তাকে বললাম-আমি  গান তো গাই না। তবে এরপর থেকেই আমার গান গাওয়া শুরু....।

(কথা বলতে বলতেই আয়েশি ঢংয়ে চায়ের কাপটি নিয়ে পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসলেন…আর বললেন কীভাবে গান…)

প্রিয়.কম: নিশ্চিত আয়ের পেশা থেকে অনিশ্চিত আয়ের পেশায় আসার যে পরিকল্পনা তখন বেছে নিয়েছিলেন-সেসময় ঝুঁকিটা ঠিক কী ভেবে নিয়েছিলেন?

হায়দার হোসেন: আমি তো দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। তারপর না মিউজিকে এসেছি। আর আমার বাইরে (যুক্তরাষ্ট্রে) থাকতে ভালো লাগতেছিলো না। সেখানে আর কি করব? আমি দেশে থাকতে চাই। আমার বড় ভাইও দেশের বাইরে পড়াশোনা করেছে। আমি যেমনই থাকি না ক্যান আমি দেশে থাকতে চাই। বিষয়টা হলো এমন-আরেকজনের ঘর তো আরেকজনের ঘরই।

প্রিয়.কম: সঙ্গীত জগতে আপনার প্রথম দিককার সময়গুলো কেটেছে বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রে পেশাদার প্লে ব্যাক মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে...কিন্তু এরপর জীবনধর্মী গান, দেশপ্রেমের গান গাইতে কেন উদ্বুদ্ধ হলেন?

হায়দার হোসেন: বিষয়টা সহজ করেই বলি-আমি যখন গান তৈরি করেছি তখন কেউ গাইতে চায়নি। যার কারণে আমিই আমার ঢংয়ে গেয়েছি। তাই আমার গানের ধরনটা আমার মতোই আলাদা।

প্রিয়.কম: আপনার প্রতিটা গানই তো কোন না কোন প্রেক্ষাপট নিয়ে...বিভিন্ন বিষয়কে তুলে ধরেছেন...এটা তো ভীষণ কঠিন কাজ-আপনি কীভাবে নিজেকে চালনা করতেন?

হায়দার হোসেন: যে কোনো গানই লেখা হয় তখন কোনো ধরনের প্রেক্ষাপট ছাড়া লেখা হয় না। কোনো না কোনো বিষয় থাকেই। বিষয়টা আসলে এরকমও না আমার মন চেয়েছে আমি গান লিখেছি। আমি আগেও বলেছি আমি পেশাদার কেউ না। কোনো ঘটনা যদি আমাকে ভাবায় কিংবা কোনো থিম যদি আমার মাথায় আসে-সেটি নিয়ে গান করা যায়।

(কথা শেষ হতেই বললেন, তোমার জন্য চা চলে এসেছে...। সেই সঙ্গে জানালা দিয়ে আসা মৃদুমন্দ বাতাসও গায়ে পরশ বুলিয়ে গেল। চায়ের কাপ হাতে তুলে ফের কথা শুরু হলো)

প্রিয়.কম: আপনি গান লিখেন সুরও করেন; কিন্তু একটি বিষয় আপনি একটি গান লেখার আগে কি কি বিষয়গুলো ভাবেন?

হায়দার হোসেন: গানটা লেখার পর এর লিরিকিই বলে দেয়-এর সুরটা কেমন হবে। সেভাবেই তৈরি করা হয়। খুশির গান হলে খুশির সুর, আর দু:খের গান হলে দু:খের সুর হতে হবে। গান তো ৫ মিনিটের মধ্যে ১০ কিংবা ১৫টা লাইন তুলে ধরতে হয়। গান কিন্তু অনেক কথা বলে। এটা কম্প্যক্ট একটা বিষয়। আর এর কথাগুলো বোজানোর জন্য আমরা এর সুর আরোপ করি। আরো নির্দিষ্ট করে বলার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করি। মূলত বিষয় হলো-পিকচারাইজড করা। এটা বলা চলে এক ধরনের ফিল্ম।

প্রিয়.কম: আপনার গানে পরিচিত একটা ঢং আছে-গানের মাধ্যমে মানুষের অধিকারের কথা বলার বিষয়, সেটিকে কেন বেছে নিলেন, বিষয় হিসেবে তো আরও অনেক বিষয়ই ছিল?

হায়দার হোসেন: আমি গানের মধ্য দিয়ে যে কথাগুলো সেগুলো বলেছি সাধারণ মানুষের জীবনের কথা। তখন তারা তো সেগুলো পছন্দ করতেই পারে। সে সময় গানগুলো যেরকম হিট ছিল এখনও একইরকম হিট। বিষয়টা হলো-আপনি যে বিষয়ে কথা বলবেন-সে বিষয়ে সততা কতটুকু আছে? আর কিভাবে উপস্থাপন করছেন। তাইলেই গান মানুষ হয়ে উঠবে। আরও অনেক বিষয় আছে আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। আর প্রেম তো মানুষের জীবনেরে সাথে কানেক্ট করে। যার কারণেই প্রেমের এতো গান হয়। যখন গানের কথাগুলো সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যায়-তখন আমি মনে করি সেগুলো সাধারণ মানুষগুলো নেয়। মানুষের মনের কথা বলাটাই আসল। গান করলেই তো কেউ শুনবে না; প্রচারেরও বিষয় আছে।

প্রিয়.কম: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তো আপনার গানের কথাগুলোর ধরনও পাল্টে গিয়েছে?

হায়দার হোসেন: প্রত্যেক শিল্পীর আলাদা একটা চয়েজ রয়েছে। আমারও ছিল। একেক সময় সময়ের পালাবদলে ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন বিষয়ও পাল্টেছে। আমি একটা সময় প্রেমের গান করতাম। এরপর যখন আবার দ্বিতীয়বারের মতো গান শুরু করলাম তখন আর সে ধরনের গান করি নাই। কিন্তু জীবনে অনেক বিয়ষই আছে গান করার মতো।

প্রিয়.কম: ভিন্ন প্রসঙ্গ; আপনার নিজের আদি নিবাস তো পুরান ঢাকায়-এখন থাকেন সমাজের উচ্চবিত্তদের এলাকায় (বসুন্ধারা আবাসিক এলাকা)। পুরনো ঢাকায় থাকাকালীন সে সময়গুলো ঠিক কেমন মিস করেন?

হায়দার হোসেন: আমি পুরনো ঢাকার মানুষ। আদি নিবাসও সেখানে। বেগম বাজারের মানুষ আমরা। ঢাকা আমার গ্রাম! এখন পুরনো ঢাকায় থাকার পরিবেশ আমি দেখি না। আর মার্কেটে কী থাকা যায়? এটা কথনও থাকার জায়গা হতে পারে না। আমি যে পুরান ঢাকায় থেকে ছিলাম সে পুরনো ঢাকা এখন তো আর নেই। যার কারণে ওটাকে আমি থাকার জায়গা বলতে পারি না। হ্যাঁ পুরনো ঢাকায় আমার থাকা হবে মরার পরে। কারণ আমাদের পারিবারিক কবরস্থান সেখানে। আমার কাছে ওই সময়ের পুরনো ঢাকার জীবনগুলো সুন্দর। মানুষ বেড়েছে কিন্তু জায়গা তো আর বাড়ে নাই। আর গিঞ্জি। যার কারণে যেতেও ইচ্ছে করছে না।

প্রিয়.কম: বর্তমানে ব্যস্ততা কী নিয়ে?

হায়দার হোসেন: আমার একটা ফ্যাক্টরি আছে-যেখানে ক্লিনিং কেমিক্যাল বানাই। এটা আমার প্রধান পেশা। একটা বিষয় শেয়ার করি-আমার মেটাল ক্লিনিং ক্যামিক্যালগুলো সমস্ত দেশিয় উপকরণ দিয়ে তৈরি। এবং আমার যতগুলো মেশিন রয়েছে সেগুলো আমার এখানে বানানো। এছাড়া আমার আরও একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে আমি এক্সুকিউটিভ ডিরেক্টর।

(এরমধ্যে কেমিক্যালের একটি বোতল আর সঙ্গে নিয়ে এলেন মেটালের রেপলিকা রিকশা। সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করে দেখালেন...)

প্রিয়.কম: আর গানের ব্যস্ততা?

হায়দার হোসেন: আমি তো শখে গান করি। আমার যখন প্রয়োজন পরে তখনই গান গাই। গান দিয়ে আমার জীবিকা নয়। আমাদের এখানে গান দিয়ে জীবিকা অর্জনের সময় এখনও আসে নি। কোন শিল্পীর গান যখন লাইম লাইটে চলে আসে তখন গানটা আর শিল্পীর থাকে না। এর থেকে আয়গুলো চলে যায় অন্যজনের হাতে। গান করে আপনি স্ট্যাবিলিস হয়ে যাবেন; এটা ভীষণ কঠিন। একটা গান লিখবো। এখনও লিখি নি। লিখবো। থিমটা মাথায় ঘুরছে।

প্রিয়.কম: এখন তো অনলাইন মাধ্যমগুলোতে গান প্রকাশের এক ধরনের হিড়িক পড়েছে, আপনি কীভাবে দেখেন?

হায়দার হোসেন: আমি আসলে এ বিষয়ে বলতে পারব না। কারণ এখন আমি খুব একটা গানের খোঁজ খবর রাখি না। এখন কি রকম গান হচ্ছে; কিংবা কারা গান করছে এসব বিষয়েও আমি আসলে জানি না। আর আমি গান শুনি না বহু বছর ধরে। অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আগে শুনতাম। যখন বয়স কম ছিল। তখন দিনের বড় একটা সময় গান শুনে কাটাতাম। যখন কোন স্টেজে যাই কিংবা কোন অনুষ্ঠানে যাই তখন এসব বিষয় শুনি।

প্রিয়.কম: ব্যক্তি হায়দার হোসেনের পোশাকি ঢং দেখলে একটি বিষয় মনে হয়-খুব শৃঙ্খল জীবনযাপন করেন আপনি?

হায়দার হোসেন: সত্যিই, আমি শৃঙ্খল জীবনযাপন পছন্দ করি। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন কখনও আমি পছন্দ করি না। মানুষ তো সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। শুধু একটা বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে -সেটি হলো মন। আমি সেটা করার চেষ্টা করি। আর যখন কেউ মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন তখন সে তো পশু হয়ে যায়।

প্রিয়.কম: আপনি কীভাবে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন?

হায়দার হোসেন: আমি চেষ্টা করি। শতভাগ তো আসলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবও নয়। শৃঙ্খল জীবন খুব মজার। একটা বিষয় দেখেন-আমার ঘরে মানুষ আছে কিন্তু কোন চেঁচামেচি নেই। আমার বাসায় গান শুনলে কেউ জোড়ে আওয়াজ করে শুনবে না। বাসায় শান্তি থাকতে হবে। যে কাজ সমাজের জন্য মঙ্গলজনক নয়; সে কাজ তো আর আমি করি না। এটাও তার একটা অংশ।

প্রিয়.কম: আপনার পারিবারিক জীবন কেমন চলছে?

হায়দার হোসেন: আমার স্ত্রী আর একটি মেয়ে। এই নিয়ে আমার সংসার। মেয়েটি অনার্সে নর্থ সাউথে পড়ছে। সর্বোপরি আমার সংসারজীবন ভালোই চলছে ।

প্রিয়.কম: প্রিয়.কমকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

হায়দার হোসেন: প্রিয়কেও।

সম্পাদনা: গোরা/ কুদরত উল্লাহ