ছবি: সংগৃহীত

একটি মৃত রাস্তা ও জনৈক জনপ্রতিনিধি

ধুলোমাখা রাস্তার দু ধারেই ঝুলছে জনপ্রতিনিধির ধুলোমাখা উন্নয়নের স্লোগান৷

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৯:১৪
আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০১৮, ১৬:৩৩


ছবি: সংগৃহীত

আমরা বাংলাদেশি মানুষগুলো খুব নিষ্পাপ আর ভোলা-ভালা ধরনের। একটু আরাম হলেই কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে যাই৷ কষ্ট লাঘব হয়ে গেলে কষ্টদাতার কথাও ভুলে যাই৷ পাশে গিয়ে সেলফিও তুলি, হাত মেলাই, কোলাকুলি করি৷ তার গুণগানও করি৷ তাই আবার হয় নাকি? কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? উদাহরণ দিই? 

ধরা যাক, আপনার এলাকায় রাস্তা খুব ভঙ্গুর দশা৷ দিনের পর দিন এভাবেই আছে৷ এলাকার জনপ্রতিনিধি, যিনি আপনাকে সুখে রাখবে বলে কথা দিয়ে ভোটভিক্ষা করতে এসেছিলেন, তিনিও এলাকায় থাকেন না৷ ঢাকায় গিয়ে সভা- সেমিনার করে বেড়ান, লম্বা চওড়া বক্তৃতা দেন৷ জনগণের জন্য কলিজা পুড়ে যায় টাইপের কথাবার্তাও বলেন৷

এভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ভাঙাচোরা রাস্তায় চলতে চলতে আপনাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। রাস্তা মেরামতের জন্য আন্দোলন, মানববন্ধন করতে থাকেন। কিছুতেই কাজ হয় না। এলাকার পরিচিত মানুষগুলো এই রাস্তাতেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা যায়, অসহায়ের মতো চোখের সামনে দেখতে থাকেন। দুঃখে চোখ ভিজে যায়৷ মনে মনে হাজারো অভিশাপ দিতে থাকেন জনপ্রতিনিধিকে৷

শেষমেষ, কোনো এক কালে রাস্তা ঠিকই মেরামত হয়। মাঝখান দিয়ে কতগুলো অসহায় তাজা প্রাণ ঝরে যায়। জনপ্রতিনিধি মশাই এক পাটি দাঁত কেলিয়ে রাস্তার উদ্বোধন করে দিয়ে যান। যদিও সেটার স্থায়িত্বকাল একটি কী দুটি বর্ষা। আর এতেই বাঁদরের হাতে সবরি কলা গেলে যেভাবে বাঁদর খুশিতে হাত তালি মারে, সেভাবেই খুশিতে তালি মারতে মারতে গদগদ হয়ে যান।

উল্টাপাল্টা স্লোগান ও চলতে থাকে ‘অমুক ভাইয়ের দুই নয়ন, এলাকাবাসীর উন্নয়ন’৷ স্লোগান তো আসলে হবে ‘এলাকাবাসীর দুই নয়ন, অমুক ভাইয়ের উন্নয়ন’। হায়রে অসহায় মানুষ!

আবার ভোট চাইতে আসলে পশ্চাৎদেশে লাথি মারার কথা চিন্তাও করি না। আবার তাকেই ভোট দিই। একজন সাধারণ মানুষ কত ধৈর্য্যশীল হলে এগুলো করতে পারে?

এবারে বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের দেশে কুষ্টিয়া নামের একটি জেলা আছে। দেশের ভেতরে জেলাটি মোটামুটি ভালোই বিখ্যাত। বেশ কয়জন গুণী মানুষের জন্মস্থান এই কুষ্টিয়া। একে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। তার থেকেও বিখ্যাত কুষ্টিয়ার তিলের খাজা৷

বিখ্যাত তিলের খাজার থেকেও বিখ্যাত এখন কুষ্টিয়ার রাস্তা। কুষ্টিয়ার রাস্তা এখন পুরো বাংলাদেশের মধ্যে মোটামুটি বিখ্যাত রাস্তা। আমার জানা মতে, কোনো কালেও কোনো রাস্তা আজ অবধি এত বিখ্যাত হতে পারেনি। উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের সংযোগের একটা মাধ্যমই ওই বৃহত্তর কুষ্টিয়ার রাস্তা।

আমি দেশ থেকে চলে এসেছি তিন মাস হয়ে গেল। তখনই দেখে এসেছি রাস্তার দুর্দশা। ছোট-বড় গর্ত তো আছেই, এমনও জায়গা আছে, দেখলে মনে হবে ধুলিঝড়ের পরে মরুভূমি যেমন দেখতে হয়, ঠিক তেমন। প্রতিদিনই পত্রিকাতে দুর্ভোগের খবর পাই, টিভিতে প্রতিবেদন দেখি। কষ্ট লাগে অনেক। অসহায় মানুষগুলোর জন্য খুব কষ্ট লাগে। প্রতিদিনই দুই একটা দুর্ঘটনা লেগেই আছে৷ প্রাণহানি ঘটছে। আমি নিজেই দেখেছি। এই পথ পাড়ি দেওয়া মানে দুর্গম উপত্যকা পাড়ি দেওয়া। ওই রাস্তা মেরামতে জনগণের আন্দোলন চলছেই।

রাস্তা দেখে এটা কোনো রাস্তা মনেই হবে না। বর্ষাকালে মনে হবে নোংরা খাল এবং গ্রীষ্মকালে মনে হবে বালুচরের মরুভূমি।

মজার বিষয় হচ্ছে, ধুলোমাখা রাস্তার দুই ধারেই ঝুলছে জনপ্রতিনিধির ধুলোমাখা উন্নয়নের স্লোগান, ‘কুষ্টিয়া উন্নয়নের রূপকার অমুক জনপ্রতিনিধির দুই নয়ন, কুষ্টিয়াবাসীর উন্নয়ন’, হেনো-তেনো ইত্যাদি৷

মাঝখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এসেছিলেন কুষ্টিয়াতে। তখন কুষ্টিয়াবাসী আশার আলো দেখেছিল। হয়তো এই অজুহাতে হলেও রাস্তাগুলো ঠিক করা হবে। কিসের ভাবনা আর কিসেরই বা আশা।

রাস্তায় আলকাতরার পুডিং মেরে মেরে ছেঁড়া পায়জামায় রিপু করার মতো করে সারিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রপতির চোখে কালো সানগ্লাস পরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। কাজের কাজ কিছুই হলো না।

আমার মনে হয় দেশের রাস্তাগুলো মসৃণ করার জন্য হলেও অন্তত প্রধানমন্ত্রীর উচিত দেশের অলিগলিতে মাঝেমধ্যে ঢুঁ মারা। তাতেও কী কাজ হবে?

রাস্তা মেরামতের অর্ধেক টাকা চলে যাবে রাস্তার মাঝে প্রধানমন্ত্রীর গুণগান সংবলিত তোরণ বানানোর নামে চামচামি করতেই৷ সেখানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে তোরণওয়ালা নেতার ছবি বেশি বড় দেখাবে৷ তার নিচে ছোট করে লেখা থাকবে ‘প্রচারে এলাকাবাসী’৷ অথচ এলাকাবাসী তখন ভাঙা রাস্তায় ঝাঁকি খেতে খেতে কাজে যাচ্ছে৷

নিজের পাবলিসিটি সবার আগে-পরে অন্য কিছু। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির গতিতেই হয়তো রাস্তার মসলা খসে চলে যাবে। পড়ে থাকবে ওই ধুলাবালি, ছোট-বড় গর্ত, আর মৃত রাস্তার ‍দুই পাশের জনপ্রতিনিধির উন্নয়নের স্লোগান।

ভাঙা রাস্তা তো একদিন ঠিক হবেই৷ সাদা পাঞ্জাবি পরে হয়তো জনপ্রতিনিধি ঢাকা থেকে আসবেন। জনগণের পকেটের টাকা দিয়ে বানানো রাস্তা খুব হম্বিতম্বি করেই উদ্বোধন করবেন। কী দয়া দেখিয়ে গেলো! আহ! এই না হলে নেতা! মাঝখানের কষ্টের দিনগুলো, বিনা অপরাধে ঝরে পড়া তাজা প্রাণগুলোর কথা সবাই বেমালুম ভুলে গিয়ে উন্নয়নের জয়ধ্বনি দিতে থাকবে৷

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
ফের রাস্তায় নামছে ইয়েলো ভেস্ট
ফের রাস্তায় নামছে ইয়েলো ভেস্ট
সমকাল - ১ week, ৩ দিন আগে

loading ...