ঈদে মহাসড়কে যানজটে নাকাল ঘরমুখো মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

যানজট আছে, যানজট নেই

অনলাইন দুনিয়ায় বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমে মানুষ যে পরিমান সময় কাটায়, তার এক’শ ভাগের একভাগও খবরের কাগজ পড়াতে, ৫ ভাগ টিভির খবর দেখাতে সময় দেয় না।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০১৮, ১৬:১৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:৪৮
প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০১৮, ১৬:১৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:৪৮


ঈদে মহাসড়কে যানজটে নাকাল ঘরমুখো মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

গণমাধ্যম যদি কোনো কিছু ‘ব্ল্যাকআউট’ করে, তাহলে কী তা জানা যাবে না? হয়তো এক সময়ের উত্তর ছিল, না যাবে না। কিন্তু এখন কী সেদিন আছে, মেইনস্ট্রিম জার্নালিজমকে চ্যালেঞ্জ করতে এসেছে সিটিজেন জার্নালিজম, নাগরিক সাংবাদিকতা। অন্য অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতা। এখন আর লুকোছাপা করে খুব সুবিধা করা সম্ভব নয়। হয়তো, লুকোছাপায় প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো যায় কিন্তু যাদের জন্য লুকোছাপা তাদের রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

অনলাইন দুনিয়ায় বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে মানুষ যে পরিমাণ সময় কাটায়, তার একশ ভাগের একভাগও খবরের কাগজ পড়াতে, পাঁচ ভাগ টিভির খবর দেখাতে সময় দেয় না। আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে গণমাধ্যমের সব খবরই চলে আসে মানুষের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। সুতরাং লুকোছাপার দিন শেষ। লুকোছাপায় হয়তো পিঠ বাঁচবে কিন্তু পেট বাঁচবে না। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান টিকবে না।

গণমাধ্যমের অনেক জায়ান্টকেই ইতোমধ্যে পতিত হতে দেখেছে মানুষ। এক সময় মারকাট রব ছিল এমন অনেক মাধ্যমের নামই ভুলে গেছে আমজনতা। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক মহীরূহই হয়েছে প্রপাত ধরণিতল। যদিও টিভি সাংবাদিকতা বাংলাদেশে কেবল কৈশোরে, বাল্যতে অনলাইন জার্নালিজম। তবু এ মাধ্যম দুটিরও অবস্থা তথৈবচ, অল্প সময়েই অনেকগুলো অর্ধমৃত। কোনটার অবস্থা হয়েছে পর্বতের মূষিক প্রসবের মতো।

কেন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে পাঠক-দর্শকপ্রিয়তার কথা এসে যায়। অবশ্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কারণেও রুগ্ন হয়েছে। অন্যদিকে যাদের অর্থনীতির চিন্তা নেই, তারা অপসৃয়মান হয়েছে নিজ বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবার দায়ে।

বিশ্বাসযোগ্যতা না হারিয়ে যাবে কোথায়। সম্প্রতি দুটি ঘটনার কথা সবারই জানা। বিএস-১ স্যাটেলাইটের বিষয়টি, আকাশে উড়ার একদিন আগেই গণমাধ্যম তা উড়িয়ে দিল এবং কাব্য করে শিরোনাম করলো নানান ঢংয়ে। সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যম মরার আগে মেরে ফেললো অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানকে। টিভি স্ক্রল বা টিকারে চালিয়ে দেয়া হলো, ওনি আর নেই বলে। অনলাইন নিউজ পোর্টালের অনেকগুলোই হলো এমন সংবাদের অনুগামী। গণমাধ্যমের এহেন দায়িত্বহীনতায় বাধ্য হয়েই সামাজিক মাধ্যমকে বেছে নিলেন এটিএম শামসুজ্জামান স্বয়ং। নিজের সংবাদে নিজেই হলেন ‘মিডিয়াম্যান-প্রেজেন্টার’। ফেসবুক লাইভে এসে খোদ বললেন, আমি মরি নাই! অদ্ভুত এ দেশের এসব গণমাধ্যমের দায়িত্ববোধ! আর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে তো সেলুকাস!

‘এবার ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন, কোথায় যানজট নেই’, এমন কথা বললেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গণমাধ্যমেও দেখা গেলো ঈদযাত্রা মোটামুটি নির্বিঘ্ন। গণমাধ্যমের দিকে চোখ বুলালে, সবারই মনে হবে এবারের ঈদ যাত্রা নিয়ে টেনশন নেই, ছিল না। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোতে ‘সড়ক’ নিজেই টেনশন হয়ে ‘মেনশন’ করলো ঘরমুখোদের। চার ঘণ্টার যাত্রা চুইংগাম হয়ে দাঁড়ালো ১৩ ঘণ্টায়। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখনো থেমে থাকা, কখনো শম্বুক গতি এভাবে হয়েছে ঘরমুখোদের ঘরে ফেরা। অথচ গণমাধ্যমের সড়ক চিত্র বলে অন্যরকম, তাদের ভাষায় ‘নো টেনশন’। এরমধ্যে হাতেগোনা কটি মাধ্যম কিছুটা চেষ্টা করেছে ভোগান্তির দৃশ্য তুলে ধরতে। কিন্তু সব মিলিয়ে যা উঠে এসেছে, তা দুর্ভোগের দশ ভাগও নয়।

অনেকে বলছেন, এবার বাসে চাপ কম, ট্রেনে ভিড় বেশি। কথাটা সত্যি। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে মানুষ ট্রেনেই নিরাপদ বোধ করেছে বেশি। কোনো গণমাধ্যম মুখ ফুটে এ কথাটি বলে ফেলেছে। তারপরও কোথায় যেন একটা রাখঢাক রয়ে গেছে, পুরোটা বলতে কোথায় যেন আটকে গেছে। বিপরীতে সামাজিক মাধ্যমের নাগরিক সাংবাদিকতা বসে থাকেনি, জানিয়ে দিয়েছে সড়কের বেহাল অবস্থার কথা, ঈদ যাত্রার ভোগান্তির কাহিনী।

পুনশ্চ: একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে গিয়েছি। কথা হচ্ছিল ওনার সাথে। এর মাঝে জানালেন, তার পরিচিত একজন ট্রেনের বা বাসের টিকিট ম্যানেজ করার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন। যে অনুরোধ করেছেন তিনিও সরকারি কর্মকর্তা। তার আশঙ্কা যানজটকালে তার পক্ষে টিকিট ম্যানেজ করা সম্ভব হবে না। বোঝেন অবস্থা। তারপরেও গণমাধ্যম বলে, যানজট নেই- আবার বলে, যানজট আছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমকে কী অনেকটা ঘড়ির পেন্ডুলামের মতন মনে হয় না- দোদুল্যমান।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]