(প্রিয়.কম) ক্ষুধার্ত চেহারা। মুখে কোনো শব্দ নেই। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর কিছুক্ষণ পর পর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ভীত-বিধ্বস্ত চেহারা। ভয়ে অনেকটা কাতর। নতুন কাউকে দেখলে আতঁকে উঠে। রাস্তার পাশে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুপড়ি করে অবস্থান নিয়েছেন তারা। কখন খেয়েছে কেউ জানে না। একটু পানি যেন তাদের সম্বল। সেই পানিটুকুও ঠিকমতো পাচ্ছে না তারা। এই চিত্র এখন কক্সবাজার জেলার উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, হোয়াইক্যংসহ আশপাশ এলাকায় অবস্থানরত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজারো রোহিঙ্গাদের।

প্রাণ বাঁচাতে অনাহার-অর্ধাহারে রাত দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা। এমন করুণ পরিণতি নিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছার পরও খাদ্য-পানি এবং চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে একের পর এক রোহিঙ্গা। ছোট ছোট শিশুদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। অপুষ্টি ও ক্ষুধায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ধকল সইতে না পেরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে শিশুরা। অসুস্থ বৃদ্ধরাও চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ক্ষুধা ও অসুস্থতায় চিকিৎসার অভাবে কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে মিয়ানমার ভূসিডং শহরের ফাতিয়া পাড়া থেকে এসেছেন মোহাম্মদ জোবাইর। গত ২ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের আর্মি ও স্থানীয় বৌদ্ধ-রাখাইনরা তার ঘরে আগুন দেয়। তখন তার পরিবারে সদস্য ছিল ১৫ জন। কিন্তু অন্যদের হারিয়ে আট জনকে নিয়েই পালিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। আসার পথে অসুস্থ দুই শিশু মারা যায় বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আসার সময় দুর থেকে গুলি করা হয়েছে। আমার ভাইপু রাসেলের গায়ে গুলি লেগেছে। ইচ্ছে করছে মরে যেতে।’

জোবাইর আরও বলেন, ‘এ কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। গত তিন ধরে কিছু খায়নি। বাচ্চারা খাবারের জন্য ছটপট করছে।’

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে জোবাইরের কথা হয় হোয়াইক্যং বাজার থেকে পূর্বে মাদ্রাসা পয়েন্টে। তার সঙ্গে কথা বলতে দেখে দৌঁড়ে আসেন আমজাদ। এসেই কান্না। গত শনিবার (২ আগস্ট) সকালে সে জন্মস্থান মংডুর চিলিগুড়ি ত্যাগ করেন। তার মতে, সবাই তখন ঘুমের মধ্যে। হঠাৎ চিৎকার। চারিদিকে যেন কান্নার রোল। কিছু বুঝে উঠতেই আগুনের লেলিহান শিখা যেন আচড়ে পড়ছে ঘরের ভেতর।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

যে দিকে পারছে দিকবিদিক ছুটছে মানুষ। আমজাদ দেখতে পান তার দশম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে ইয়াসের (১৮) কে লম্বা ছুরি দিয়ে জবাই দিচ্ছে। সে অন্য সদস্যদের বাচাঁতে পেছন দিয়ে পালিয়ে যায়। এ রকম লৌহমর্ষক ঘটনার বর্ণনা যখন দিচ্ছিলেন তখন তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবসা করতাম। আমার ১২ কানি জমিন ছিল। আমরা তিন ভাই একসাথে থাকতাম। সবাই বিয়ে করেছে। পরিবারের সদস্য ছিল ১৪ জন। এখন কে কোথায় আছে কেমন আছে আমি কিছইু জানি না।’

একটু হেটেঁ সামনে গেলে হোয়াইক্যং সীমানায় জায়গার নাম লাম্বার বিল। সেখানে দেখা গেল নবজাতককে নিয়ে অঝরে কাদঁছে লতিফা। পাশে এক বৃদ্ধা। এ প্রতিবেদকে দেখে কান্না থামালেন ওই নারী। তিন দিন ধরে সে কিছু খায়নি। মনে করেছিলেন খাবার নিয়ে কেউ তার কাছে এসেছে। কথা বলার যেন শক্তিটুকুও তার নেই। কে যেন একটা বিস্কুটের প্যাকেট দিল তাকে। তবুও কিছু জানার চেষ্টা করতে চাইলে তিনি জানালেন, গত ১ সেপ্টেম্বর মংডু’র রেইজ্যা পাড়া থেকে ঘর ছাড়েন। আর ৫ সেপ্টেম্বর সোমবার সে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

ওই নারী জানান, আসার পথেই নাফ নদীর সীমান্তে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলে তাকে কয়েকজন প্যারাবনের আড়ালে নিয়ে যায়। সেখানে সে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এখনো পর্যন্ত তিনি কোন চিকিৎসা সেবা পায়নি। কাপাঁ কাপাঁ কন্ঠে লতিফা কথাগুলো বলছিলেন আর ওই নবজাতক শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখছেন দু’চোখ ভরে। লতিফা বলেন, ‘আমি এখানে কিছু চিনি না। আমি খুব অসুস্থ। আমার ছেলের গায়ে জ্বর। আমি ওষুদ খেতে চাই। আমার চিকিৎসার প্রয়োজন।’

নাফ নদী সীমান্তে দেখা গেছে রোহিঙ্গাদের ঢল। যেন হাঁটার প্রতিযোগিতা। কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই। হাঁটতে না পেরে অনেকে রাস্তার পাশেই বসে পড়েন। এর পরও বাংলাদেশে ঢুকতে পেরে ক্লান্ত দেহে যেন অানন্দের সু-বাতাস। গন্তব্যে পৌঁছতে কোন কিছুই যেন রোহিঙ্গাদের আটকাতে পারছে না। তবুও প্যান্ট পরা কাউকে দেখলে তাদের ভয় হয়। যদি পুশব্যাক করে। দেখা গেছে একটি সুরঙ্গ দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা।বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

সেখানে ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জাফর আলমের দেখা মেলে। অসুস্থ শরীর, বয়সের চাপ। কিছুই যেন থামাতে পারেনি তাকে। বয়সের সঙ্গে যেন লড়াই করছে জাফর। আর আজিজুর রহমান বলেন, আমার পরিবারের আট জনকে জবাই করেছে। রাতের অন্ধকারে প্রাণ নিয়ে শুধু আমি বেঁচে এসেছি। সয়-সম্বল কিছুই আনতে পারিনি বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর পরও তিনি বলেন, যাই হোক সে দেশেতো আমার জন্মভূমি।

রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্টে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর ১১ দিনে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের ভিডিও দেখুন নিচে-

প্রিয় সংবাদ/শিরিন