যন্ত্রসঙ্গীতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন শিল্পীরা। ছবি- কালপুরুষ অপূ

উন্মোচিত হলো 'ভ্রমণকন্যা'

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ছিল ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের ১ বছর পূর্তি। ভ্রমণ দলের জন্মদিনে তারা আয়োজন করেন একটি আড়ম্বর অনুষ্ঠানের।

আফসানা সুমী
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৫০
আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০২:০১


যন্ত্রসঙ্গীতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন শিল্পীরা। ছবি- কালপুরুষ অপূ

(প্রিয়.কম) মানুষের মনের শান্তি যেন সবুজে। তাই একটুকরো সবুজ ঘরে জায়গা দিতে আমরা বেলকনিতে লাগাই বাহারি গাছ। সবার কি আর ঐটুকুতে মন জুড়ায়? চোখ জুড়ায়? সবুজের আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিতে অনেকেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন পথে। ছুটে যান গ্রামে, বনবনানিতে।

ঘর ছাড়াদের আরেকদল ছুটে যায় সমুদ্রে। রহস্যময় সাগরতল ছুঁয়ে জীবনের রস আস্বাদন করে তারা। অন্য আরেকদল আবার উচ্চতার নেশায় মশগুল। পর্বতের পর পর্বত তারা পাড়ি দেন জীবন বাজি রেখে।

সারা বিশ্বেই এই প্রকৃতিপ্রেমী বলুন আর রোমাঞ্চপ্রেমী বলুন, গতানুগতিক ধারার বাইরে জীবনকে উপভোগ করতে কাধেঁ ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেরিয়ে পড়া দলটি কিন্তু ভারি হচ্ছে ধীরে ধীরে। এদের মাঝে নেই কোনো নারী পুরুষ ভেদাভেদ! তবে প্রসংগ যখন বাংলাদেশ, তখন একটি মেয়ে একা পাহাড়ে, বনে-জংগলে ঘুরে বেড়াবে, বা মেয়েদের কোনো দল ঘুরে বেড়াবে অথবা সাধারণ একটা ভ্রমণ গ্রুপের সংগী হবে মেয়েটি বিষয়টি পরিবার-সমাজ সবাইকেই যেন একটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়! কোথায় যাবে, কার সাথে থাকবে, দলে ছেলে আছে কিনা, থাকলে ছেলেগুলো ক্ষতিকর কিনা, না থাকলে বিপদ হলে মেয়েরা সামলাতে পারবে কিনা এমন হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নারী ভ্রমণেচ্ছুকদের। ভ্রমণেচ্ছুক বললাম এজন্য যে প্রশ্নগুলোকে মোকাবেলা করতে পারলেই তবে নারীটি ভ্রমণে বের হতে পারেন আর একসময় অজানাকে জয়ের নেশায় সার্থক ভ্রমণকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

কিন্তু যারা প্রশ্নগুলো শুনে ভয় পেয়ে যান, 'বিয়ের পর স্বামীর সাথে ঘুরতে যেও' বা 'আগে সংসার করো' শুনে থেমে যান তাদের কি এই পৃথিবী দেখার অধীকার নেই? একটু উৎসাহ পেলে সেও হয়ত সমুদ্র, পাহাড় দেখার স্বাদটা পাবে, জানবে জীবন কি! এভাবেই হয়ত একসময় নিজের অধিকারগুলোও বুঝে নিতে শিখবে সে! এভাবেই হবে 'উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট থ্রু ট্রাভেলিং'।

এই মোটো সামনে রেখেই এগিয়ে চলেছে 'ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ' নামক সংগঠনটি। ফেসবুক ভিত্তিক নারীদের ভ্রমণদল হলেও ভ্রমণের পাশাপাশি তারা অংশ নেন বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমেও। সমাজে নারীর সার্বিক অগ্রগতিকে মূল লক্ষ্য রেখে তারা উৎসাহ দেন আরো বেশি নিজের দেশ ভ্রমণে, সম্ভব হলে বিদেশ ভ্রমণে যেতে।

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ছিল ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের ১ বছর পূর্তি। ভ্রমণ দলের জন্মদিনে তারা আয়োজন করেন একটি আড়ম্বর অনুষ্ঠানের। শিশু একাডেমির অডিটোরিয়ামে বেলা ৪ টায় শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের মাননীয় মন্ত্রী (বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়) জনাব রাশেদ খান মেনন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব জালাল আহমেদ, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান জনাব আখতারুজ জামান খান কবির, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও জনাব ড. মো. নাসির উদ্দীন, রম্যপত্রিকা 'উন্মাদ' এর সম্পাদক জনাব আহসান হাবীব ও বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী নিশাত মজুমদার।

অতিথি
অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ।  ছবি- কালপুরুষ অপূ

অনুষ্ঠানের রাখা বক্তব্যে ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মানসী সাহা জানান এ পর্যন্ত ১৮ টি ইভেন্ট করেছে এই ভ্রমণ দলটি। এছাড়া ভ্রমণ বিষয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা, বন্যাদূর্গতদের পাশে দাঁড়ানোসহ নানান সামাজিক কাজে অংশ নিয়েছেন তারা। সভাপতি সাকিয়া হক বলেন, শুধু স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোই ট্রাভেলেটস এর উদ্দেশ্য নয়। তারা দেশের সবক'টি জেলায় যেতে চান, সেখানকার স্কুলে একটি সেশন পরিচালনা করতে চান যেখানে নারী স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হবে, দেশের ভ্রমণস্থলগুলো চেনানো হবে শিক্ষার্থীদের। ইতোমধ্যে ২০টি জেলায় কাজ করেছেন তারা।

ভ্রমণপ্রিয় সিন্থিয়া তার সিলেট ভ্রমণের গল্প বলেন। পাশাপাশি সিলেটের ভ্রমণস্থলগুলোর পথের দূর্দশা তুলে ধরেন। একইসাথে আলোকপাত করেন দূর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও। আরেক ভ্রমণ পিপাসু নারী রুমানা টরাস বলেন, ভ্রমণ তার কাছে থ্রিলার মুভির মতো, যার নায়িকা তিনি। নিজের ভ্রমণের অনুভূতি জানানোর এক পর্যায়ে তিনি বলেন, দেশের এমন অনেক অপূর্ব জায়গা রয়েছে নিরাপত্তাজণিত কারণে যেখানে যাওয়া নিষেধ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই জায়গাগুলো ভ্রমণকারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার আহবান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে বক্তব্য রাখেন মাননীয় অতিথিবৃন্দ। নিশাত মজুমদার, বাংলাদেশি প্রথম নারী এভারেস্ট জয়ী তিনি। নিজ ভ্রমণ ডায়েরী থেকে পড়ে শোনালেন মানাসলু পর্বত আরোহণের গল্প। ভয়ানক বন্ধুর পথে পাড়ি দেওয়ার সেই গল্প শুনতে শুনতে গায়ের রোম খাঁড়া হয়ে যাচ্ছিল, শিউরে উঠছিলাম যেন! জানালেন, এই পর্বত জয় করা হয়নি তাঁর! কারণ দলের প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেনের প্রতুলতা ছিল না। সিদ্ধান্ত হয় এম এ মুহিত মানাসলু সামিট করবেন আর ফিরে যাবেন নিশাত। নিশাত বলেন, দলের জয়ই প্রধান, ব্যক্তির নয়। প্রতিটি সামিটের পিছনেই এমন অসংখ্য কম্প্রোমাইজের গল্প থাকে, এভাবেই এগিয়ে যায় দল, আসে বিজয়।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান জনাব আখতারুজ্জামান খান কবির ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান তাদের এই উদ্যোগের জন্য। পাশাপাশি বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসা পর্যটন বিষয়ক সমস্যার প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ভ্রমণ আর এখন শুধু বেড়ানো আর প্রকৃতি দেখার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভ্রমণ এখন অনেক বেশি এক্টিভিটি নির্ভর। নারীরা ভ্রমণ করবেন এবং তাদের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত হয় সে দিকে পর্যটন কর্পোরেশন সবসময়ই মনযোগী। স্বাবলম্বী নারীরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াবেন। তারা যেখানেই বেড়াতে যান না কেন পর্যটন কর্পোরেশনকে যদি জানান তাহলে থাকার ব্যবস্থা করা। পর্যটন কর্পোরেশনের আওতায় অনেক সরকারি হোটেল মোটেল রয়েছে যেখানে নিশ্চিন্তে থাকা সম্ভব। ক্যাম্পিং করতে চাইলেও সমস্যা নেই। সেসব হোটেল-মোটেলের আঙ্গিনায় তাবু ফেলা যাবে। পর্যটন কর্পোরেশন তাদের যাবতীয় সহায়তা করবেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।

মেনন
বক্তব্য রাখছেন মাননীয় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।  ছবি- কালপুরুষ অপূ

মাননীয় পর্যটন মন্ত্রী জনাব রাশেদ খান মেনন তার মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, 'পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায় আমাদের দেশে নারী-পুরুষের মাঝে বৈষম্য অনেক কম। গ্রামের মেয়েরা এখন অনেক এগিয়ে গেছে। পরিবর্তনটা চোখে পড়ে গ্রামে গেলেই। ট্রাভেলেটস এর মেয়েরা যখন এমন একটি উদ্যোগের কথা বলে আমি সহযোগিতা করি। কিন্তু ভাবিনি এত দ্রুত এত কাজ তারা করতে পারবে। ভ্রমণ রোমাঞ্চের জন্য হোক বা যেমনই হোক দেশকে জানা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার প্রসঙ্গে বলব, এজন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ করা হয়েছে। রাস্তাঘাট ঠিক করা হচ্ছে। তবে এই সমস্যাগুলো পর্যটনকেন্দ্রিক হলেও আবার পুরোপুরি পর্যটন অধীন নয়। যেমন রাস্তা ভাঙ্গা থাকার বিষয়টি চলে যায় সড়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তবে ধীরে ধীরে এসব বদলাবে।'

নারীদের ভ্রমণকে কেন্দ্র করে সমাজের কিছু মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তবে পরিবর্তন হচ্ছে আর এই পরিবর্তনে টাভেলেটস অব বাংলাদেশ বিশেষ ভূমিকা রাখবেন বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন মাননীয় মন্ত্রী। 

লেখালেখি
মাউন্ট বাটুর ভ্রমণের গল্প লিখে ২য় স্থান অধিকার করে ড. জিনিয়া রহমান।  ছবি- কালপুরুষ অপূ

অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভ্রমণ বিষয়ক ম্যাগাজিন 'ভ্রমণকন্যা' এর মোড়ক উন্মোচন এবং ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। 'ভ্রমণকন্যা' এর জন্য লেখা আহবান করা হয়েছিল ফেসবুকে। লেখিকাদের মাঝে সেরা ৫ জন লেখিকাকে পুরষ্কৃত করা হয়। ১ম পুরষ্কার লাভ করেন রুমানা টরাস, ২য় পুরষ্কার লাভ করেন ড. জিনিয়া রহমান, ৩য় পুরষ্কার লাভ করেন সুলতানা জেসমিন সুমি, ৪র্থ হন অবনী অনন্যা এবং ৫ম স্থান অধিকার করেন ফারজানা ইয়াসমিন। বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেন মাননীয় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।

 

সম্পাদনাঃ প্রিয় ট্রাভেল/জিনিয়া 

 প্রিয় ট্রাভেল সম্পর্কে আমাদের লেখা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে। যে কোনো তথ্য জানতে মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। ভ্রমণ বিষয়ক আপনার যেকোনো লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন এই লিংকে - https://www.priyo.com/post

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট