পাথরের ভাঁজে ভাঁজে আছে এমন অসংখ্য দেবমূর্তি। ছবি: সংগৃহীত

পাহাড়ের ভাস্কর্য, নাকি ভাস্কর্যের পাহাড়?

সবুজ পাহাড়ের মাঝে অগুণতি এই মূর্তির সমারোহ সত্যিই অনন্য। এমন আর কোথাও নেই। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল ভাস্কর্যগুলো। তবে কতদিন সময় লেগেছিল, কী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, এর কিছুই জানা যায়নি বলে ঊনকোটি এখনো এক রহস্যাবৃত পাহাড়।

আফসানা সুমী
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:০৬ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১২:৪৮
প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:০৬ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১২:৪৮


পাথরের ভাঁজে ভাঁজে আছে এমন অসংখ্য দেবমূর্তি। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) চলছে ভ্রমণের ব্যস্ত মৌসুম। কক্সবাজার, সাজেক সব জায়গাই এখন সরগরম। ভ্রমণকারীদের উপচেপড়া ভিড়, সাথে লাগাম ছাড়া খরচ। এমন সময়ে যদি ঘুরতে যাওয়া যায় এমন কোথায় যা কাছে আবার ভিড় নেই? সেই সাথে আজীবন মনে রাখার মতো অপূর্ব? খুব কষ্ট করতে হবে না এজন্য। ঝটপট ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিতে পারেন ত্রিপুরার পথে। 

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিক ঘিরে আছে সেভেন সিস্টার্স। সম্প্রতি মেঘালয় ভ্রমণ জনপ্রিয় হলেও অন্য অঞ্চলগুলোয় বাংলাদেশিদের পদচারণা নেই বললেই চলে, যদিও সবদিকে যাওয়ার অনুমতি মিলবে কিনা সেটিও একটি ব্যাপার। ত্রিপুরায় বাংলাদেশীদের অনুমতির কোনো সমস্যা তো নেই-ই বরং ত্রিপুরাবাসী আমাদের আমন্ত্রণ জানায় সাদরে। 

ত্রিপুরা ভ্রমণে যে জায়গাটিতে না গেলে আপনার ভ্রমণ থেকে যাবে অপূর্ণ তার নাম ঊনকোটি। মূলত এটি একটি পাহাড়ের নাম। পাহাড়টির নাম আগে ছিল ‘রঘুনন্দন’। ৯৯ হাজার ৯৯৯ টি দেবমূর্তি বদলে দিয়েছে এর নাম। সাথে বদলে গেছে জেলা শহরটির নামও। সংখ্যাটি শুনে অবাক হলেন? বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ত্রিপুরার এক পাহাড়ে ৯৯ হাজার ৯৯৯ টি দেবদেবী ও পশুর মূর্তি রয়েছে। দেবতার প্রতি ভক্তির চরম উদাহরণ এই ঊনকোটি। তবে দুঃখজনক হলো কে বা কারা ছিলেন ঊনকোটির নির্মাতা তা জানা যায়নি আজও।

ঊনকোটিকে ঘিরে তাই জনশ্রুতির শেষ নেই। এলাকাবাসীর অনেকেই বিশ্বাস করেন, পাহাড়ের গায়ে খচিত এসব মূর্তি নয়, বরং স্বয়ং দেবতারাই অবস্থান করছেন এখানে! তাদের মাঝে প্রচলিত উপকথাটিতে বলা হয়, মহাদেব একবার দেবতাদের দলবল নিয়ে কৈলাস যাচ্ছিলেন। অনেকের মতে, তাদের গন্তব্য ছিল বানারসি। তবে গন্তব্য যাই হোক পথে পড়েছিল এই রঘুনন্দন পাহাড়। ১ কোটি সংখ্যার সেই দেবতাদল ক্লান্ত হয়ে রাতে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামেন এখানে।

কথা হয়, মানবগোষ্ঠী জেগে ওঠার আগেই সকলে স্থান ত্যাগ করে আবার রওনা দেবেন। কিন্তু ভোরে একমাত্র মহাদেবই জেগে ওঠেন ঘুম থেকে। বাকি দেবতাদের কালনিদ্রা ভাঙে না। মহাদেব রাগ করে একাই স্থানত্যাগ করেন। বাকি ঊনকোটি দেবতা পরিণত হন পাথরে।

ঊনকোটি নিয়ে যত গল্পই প্রচলিত থাক না কেন এর প্রতিটির প্রধান চরিত্র মহাদেব। আরেকটি গল্প এমন যে, মহাদেব দেবী পার্বতীকে নিয়ে কৈলাস যাচ্ছিলেন। তাদের ভীষণ ভক্ত ছিলেন কালু কামার। অসাধারণ স্থাপত্যবিদ্যার জন্য ইতোমধ্যেই সমাদৃত ছিলেন কালু। কালু আবদার করলেন মহাদেব ও পার্বতীর সাথে কৈলাস যাবেন। মহাদেব নাছোড়বান্দা কালুকে সাথে নিতে সম্মত হলেন। তবে শর্ত জুড়ে দিলেন যে, কালুকে রঘুনন্দন পাহাড়ে দেবতাদের ১ কোটি প্রতিমূর্তি গড়তে হবে। কালু ১ টি কম অর্থাৎ ঊনকোটি মূর্তি গড়তে সক্ষম হন। এরপর দেবসঙ্গ তার ভাগ্যে জুটেছিল কিনা তা অবশ্য আর জানা যায়নি।

পাথর কেটে তৈরি করা এই অসংখ্য মূর্তি যারাই নির্মাণ করে থাকুন না কেন, তাদের যে দুর্দান্ত শিল্পবোধ ও স্থাপত্যবিদ্যা ছিল তাতে সন্দেহ নেই। নাহলে ৯৯ হাজার ৯৯৯টি মূর্তি গড়া সম্ভব হতো না। মহাদেবের মূর্তি তুলনামূলক বেশি এখানে। মহাদেবের ৩০ ফুট দীর্ঘ একটি মুখাবয়ব আছে যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মনুষ্যনির্মিত পাথরের মুখাবয়ব হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া আছে বিশাল এক কালভৈরবের মূর্তি। এছাড়া আছে গণেশকুণ্ড, চতুর্ভূজ বিষ্ণু মূর্তি ইত্যাদি।

সবুজ পাহাড়ের মাঝে অগুণতি এই মূর্তির সমারোহ সত্যিই অনন্য। এমন আর কোথাও নেই। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল ভাস্কর্যগুলো। তবে কতদিন সময় লেগেছিল, কী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, এর কিছুই জানা যায়নি বলে ঊনকোটি এখনো এক রহস্যাবৃত পাহাড়। ভক্তদের মাঝে এটি কেবল পাহাড় নয়, দেবতাদের আবাস।

কালের বিবর্তনে অনেক মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি, মাটি ক্ষয় ইত্যাদি কারণে ভেঙে গেছে বেশ কিছু স্থাপনা। তবে ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জায়গাটিকে ‘ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। কিছু স্থাপনা ইতোমধ্যে সংস্কারও করা হয়েছে। 

ভ্রমণের এই ব্যস্ত সময়ে ভিন্নধারার এক পাহাড় ভ্রমণ অনন্য এক অভিজ্ঞতা যোগ করবে আপনার ভ্রমণ ডায়েরিতে। এছাড়া পাহাড়ি ত্রিপুরার সৌন্দর্যও মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। ত্রিপুরা ভ্রমণে ভিসা তো লাগবেই। পোর্ট হিসেবে বেছে নিন কৈলাসর। এদিক দিয়ে ত্রিপুরা প্রবেশ করে যে কোনো স্থানীয় যান ব্যবহার করে চলে যেতে পারবেন ঊনকোটি। শুভ হোক আপনার ভ্রমণ।

সম্পাদনা: প্রিয় ট্র্যাভেল/ জিনিয়া 

প্রিয় ট্রাভেল সম্পর্কে আমাদের লেখা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে। যে কোনো তথ্য জানতে মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। ভ্রমণ বিষয়ক আপনার যেকোনো লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন এই লিংকে - https://www.priyo.com/post।