অপ্রত্যাশিত স্থানে অপ্রত্যাশিত সন্তুষ্টি

মেনোনাইট গোষ্ঠী খ্রিস্টান, কিন্তু খুবই গোঁড়া। বাড়িতে কোনো টেলিভিশন, ইলেক্ট্রিসিটি নেই। অথচ দেয়ালে টানানো বাংলাদেশের ছবি সম্বলিত ক্যালেন্ডার।

জীবেন রায়
অধ্যাপক
১৫ এপ্রিল ২০১৮, সময় - ১৩:২৯

কানাডার মেনোনাইট সম্প্রদায়ের গ্রাম। ছবি: সংগৃহীত

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের স্মরণশক্তিও ক্রমশ লোপ পেতে থাকে। সৃষ্টির এই অমোঘ সত্য, আমাদের ডিএনএতে প্রোগ্রাম করা আছে। তবে কিছু কিছু দাগকাটা ঘটনা সহজে ভোলা যায় না। সেই টিনএজ বয়সে জীবনের প্রথম চুমু খেয়েছিলেন, আপনি হয়ত নাম ভুলে যেতে পারেন কিন্তু সেই স্মৃতি অতি সহজে মুছে যায় না। কোনো কোনো স্মৃতি মনে করে আমরা হাসি আবার হয়ত কখনো চোখের কোনে জল এসে যায়। মানুষ মাত্রই অনুভূতিপ্রবণ। এমনকি জন্তু জানোয়ার, বৃক্ষেরও অনুভূতি রয়েছে। বিজ্ঞানতো তাই বলে।

আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাব ক্লাসে আলু দিয়ে একটি এক্সপেরিমেন্ট করিয়ে থাকি। ছাত্রছাত্রীদের মজা করে বলি, দেখো এই আলুটি জীবিত। একে কাটো, এ দুঃখ পায়, কাঁদে। বিশ্বাস হচ্ছে না? কিছুক্ষণ পরেই দেখো আলুর কাটা অংশটি কেমন কালচে হয়ে যায়। এটা এই এনজাইমেটিক বিক্রিয়াটা হয়তো আলুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

সেই যাই হোক, অনুভূতিপ্রবণ মানুষ অপ্রত্যাশিত স্থানে অপ্রত্যাশিত সন্তুষ্টি পেলে তা মস্তিষ্কের সিন্ধুকটিতে তালা মেরে রাখে। কখনো তালা খুলে বের করে। নদীর পাড়ে কাঁশবনে দৌড়াতে চলে যায়। ঠিক ওখানটায় আমি আমার উপন্যাসের নায়িকাকে প্রথম চুমুটি খেয়েছিলাম। সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সেও আমি মাঝে মধ্যেই মনে করি, অনুভব করি। আত্মতুষ্টি লাভ করি। নায়িকা বেঁচে থাকলে সেও হয়ত তাই অনুভব করত।

সেই মনোজগতের সন্তুষ্টির সঙ্গে ধনী-গরিবের কোনো সম্পর্ক নেই। গৌতম বুদ্ধের কথাই ধরুন। রাজপুত্র হয়েও রাজপ্রাসাধ ছেড়ে উদাস হয়ে যান। ধ্যান যজ্ঞের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত হয়ে পড়েন। তিনি কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘জীবনে সন্তুষ্টি লাভই বড় সম্পদ’। ধন সম্পদ থাকলেই সন্তুষ্টি আসবে তেমন নয়। আবার গরিবরাও অল্পতেই সন্তুষ্টি পেতে পারে। দীর্ঘ আয়ুর সঙ্গে স্ট্রেসহীন সন্তুষ্টির একটা যোগসূত্র আছে বৈকি!

যীশুও বলেছেন, ‘তোমার যাই আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট হও’। সত্যি কথা বলতে কি সারা বিশ্বে গরিবরাই সন্তুষ্ট গোষ্ঠী।

আমার গ্রামের বাড়ির ষাটের দশকের কথা মনে পড়ছে। ঘর মেরামত, জঙ্গল সাফ, শাক সবজির মাঠ তৈরির জন্য পরিচিত কাজের লোকদের নিয়োগ দেওয়া হত। চুক্তি থাকতো, ভরপেট খাওয়া দাওয়াসহ মজুরি। আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার বিষয়টি প্রধান আকর্ষণ ছিল। আমার মা দারুন উপাদেয় রান্না করতেন। আমাদের কাজের ভদ্রলোকের খাওয়ার সন্তুষ্টি আমাকে মুগ্ধ করত। একটি ভাতও মাটিতে পড়ত না। কী সন্তুষ্টি সহকারে তিনি খেতেন। ভদ্রলোক বেঁচে থাকলে, আমি আমার রোজগারের পয়সা দিয়ে খাওয়াতাম।

বেশ ক’দশক ধরে বিদেশে কাটাচ্ছি। মাঝে মধ্যে যখন দেশে যাই, রিকশা দিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় রিকশাওয়ালা কেন জানি  আমার সঙ্গে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা শুনাতো। আমিও শুনতে চাইতাম। গন্তব্যস্থলে যাওয়ার পর আমি রিকশাওয়ালার মুখে অপ্রত্যাশিত সন্তুষ্টি দেখতে চাইতাম। আমি হয়ত ১০-২৫ গুণ ভাড়া দিয়ে দিতাম। আমি জানি ভদ্রলোক বাড়ি পৌঁছে আজকে মুরগী অথবা ইলিশ দিয়ে পরিবারের সঙ্গে ভাত খাবেন। হয়ত বৌয়ের সঙ্গে এক রিকশা যাত্রীর মহৎ আত্মার কথা গল্প করবেন।

ঢাকা শহরের খেটে খাওয়া মানুষদের কথাই ভাবুন। দু’বেলা খেতে পেলেই তারা সন্তুষ্ট। তারা হয়ত জানেই না স্মার্ট ফোন কী, স্মার্ট টেলিভিশন কী? কিংবা ইন্টারনেট কী? উনারা হয়ত অনুভবও করেন না- এগুলোর প্রয়োজন আছে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য- তাও হয়ত তাদের জানা নেই। এই বিশাল গোষ্ঠীর মানুষজনই মসজিদে যায়, মন্দিরে যায়, চার্চে যায়। প্রার্থনা করেন নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য তথা দেশের জন্য। ধনী মানুষদের মনে করিয়ে দেন, যে ঈশ্বর আছেন।

আশির দশকের প্রথমার্ধে আমি কানাডায় পিএইচডি করছিলাম। একবার কয়েক বন্ধু মিলে ড্রাইভ করে একটা গ্রামে যাই ছাগলের মাংস কিনতে। মাংসও কেনা হবে, কানাডিয়ান গ্রামটাও দেখা হবে। ভদ্রলোকের বিরাট ফার্ম হাউজ। আমাদেরকে বেশ ভালোভাবেই আমন্ত্রণ জানান মেনোনাইট পরিবারের কর্তা ব্যক্তিটি।

মেনোনাইট গোষ্ঠী খ্রিস্টান, কিন্তু খুবই গোঁড়া। বাড়িতে কোনো টেলিভিশন নেই, ইলেক্ট্রিসিটি নেই, মেয়েদেরকে স্কুলে পাঠান না। আমাদেরকে চা, কেক দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। হঠাৎ দেয়ালে টানানো একটা ক্যালেন্ডারের প্রতি আমার চোখ পড়লো। অবাক হই। এতো বাংলাদেশের ছবি সম্বলিত ক্যালেন্ডার! ভদ্রলোকোর সঙ্গে সেই নিয়ে কথা হলো। ভদ্রলোক বাংলাদেশে এনজিওতে প্রতিমাসে টাকা দান করেন বাংলাদেশি দুস্থ মানুষের কল্যাণের জন্য। মনটা অপ্রত্যাশিত সন্তুষ্টিতে ভরে উঠল। সেই থেকে এনজিও বিষয়টি আমার মাথায় ঢুকে গেল।

অবাক হলেও সত্যি একসময় বাংলাদেশে একটা এনজিওতে প্রায় পাঁচটি বছর কাজ করেছি। হয়তো বা অপ্রত্যাশিত সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্যই।

[লেখক: ড. জীবেন রায়, আমেরিকান প্রবাসী অধ্যাপক। প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

প্রিয় মতামত/গোরা 

জনপ্রিয়
আরো পড়ুন