গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ফাইল ছবি

খালেদা জিয়ার মামলায় ভিডিও কনফারেন্স বিতর্ক, সমাধান দেয়নি আদালত

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে কোনো মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় আসামির অনুপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:৫৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৭:১৬


গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আদালতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আবেদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যুক্তিতর্ক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের তর্ক-বিতর্কের এ বিষয়ে কোনো সমাধান দেয়নি আদালত।

২২ এপ্রিল, রবিবার অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয়ে খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি শেষ হয় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে। কাস্টডিতে কর্তৃপক্ষ লিখেছেন, খালেদা জিয়া সিক (অসুস্থ)। অবশ্য এ মামলায় আগামী ১০ মে পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন বর্ধিত করা হয়েছে। ওই দিন পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম প্রিয়.কমকে  বলেন, ‘আজকে (২২ এপ্রিল) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) আদালতে উপস্থিত করানোর দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তাকে আদালতে উপস্থিত করানো হয়নি। কারণ কাস্টডিতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া সিক (অসুস্থ)।’

আমিনুল আরও বলেন, ‘দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে মৌখিক আবেদন করে বলেছিলেন, যেহেতু খালেদা জিয়া অসুস্থ তাই মামলার শুনানিতে তাকে সশরীরে হাজির না করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হোক। এরকম ব্যবস্থা বাংলাদেশের কোনো আইনে নেই।’  

এই আইনজীবী আরও বলেন, উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ভিডিও কনফারেন্সের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি আদালত। তিনি বলেন, ‘তারা (দুদকের আইনজীবী) ভিডিও কনফারেন্সের আবেদনটি লিখিত আকারে করেনি, মৌখিকভাবে করেছে। তাদের আবেদনটি আদালত মঞ্জুরও করেনি, খারিজও করেনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে বাংলাদেশের কোনো আইনে নেই- আসামির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে।’ তিনি বলেন, ‘দুদকের আবেদন ভিত্তিহীন।’ 

খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া প্রিয়.কমকে  বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী আদালতে ভিডিও কনফারেন্সের বিষয়ে যেসব কথা বলেছেন, সেটি ভিত্তিহীন কথা। এরকম আবেদনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা (দুদক) আইনের বাইরে এমনই এক ধরনের কথা বলেন।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান প্রিয়.কমকে  বলেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আদালত খালেদা জিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একটি আবেদন করেছে কমিশন। কিন্তু সে আবেদনের বিপক্ষেও শুনানি করছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। তিনি বলেন, ‘আবেদনের ব্যাপারে আদালত যেটি নির্দেশনা দেবেন, সেটিই আমাদের মেনে নিতে হবে। সাবজুডিস ম্যাটারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের আরেক আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল শুনানির সময় আদালতে বলেন, ‘তাকে (খালেদা জিয়া) আদালতে উপস্থিত করা না গেলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার পরিচালনা করা যেতে পারে। ভারতে এমন নজির আছে।’

পরে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান যুক্তিতর্ক শুনানির দিন পিছিয়ে ১০ মে নতুন দিন ধার্য করেন।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে কোনো মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় আসামির অনুপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। প্রিয়.কমের  সঙ্গে কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে। কেউ বলছেন- দুদক আইন, সাক্ষ্য আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি; বিশেষ ক্ষমতা আইনের কোথাও এটি উল্লেখ নেই যে, কোনো মামলার যুক্তিতর্ক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হবে। আবার কেউ বলছেন, ভিডিও কনফারেন্সের যুক্তিতর্ক গ্রহণে আপিল বিভাগের ডিরেকশন অছে।

এ বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৩ ধারায় বলা আছে, ‘আসামির উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ করিতে হইবে: স্পষ্টভাবে ভিন্নরূপ না থাকিলে বিংশ ও দ্বাবিংশ এবং ত্রয়োবিংশ অধ্যায় অনুসারে গৃহীত সমস্ত সাক্ষ্য আসামির উপস্থিতিতে অথবা তাহার ব্যক্তিগত উপস্থিতি যখন প্রয়োজন না হয়, তখন তাহার অ্যাডভোকেটের উপস্থিতিতে গ্রহণ করিতে হইবে।’

সাক্ষ্য আইনের ৩ ধারায় বলা আছে, ‘আসামির সাক্ষ্য গৃহীত হবে কোনো ডকুমেন্ট, ফটোকপি, ফটোগ্রাফি, পত্রিকার প্রতিবেদন, অডিও, ভিডিওর মাধ্যমেও। কিন্তু আসামির অনুপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার যুক্তিতর্ক গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ নেই।’  

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন প্রিয়.কমকে  বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটির বিচারকার্য পরিচালনা করা হচ্ছে বিশেষ আইনে (স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট)। এই স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের কোথাও নেই আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য বা সাক্ষ্য গ্রহণ বা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা যাবে। আর্গুমেন্ট করা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘দুদকের আইনজীবী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আর্গুমেন্ট করার আবেদন করেন। এসব সাবমিশনের কোনো ভিত্তি নেই।’ 

এ বিষয়ে মহাজোট সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ প্রিয়.কমকে  বলেন, ‘আসামির অনুপস্থিতিতে আদালতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ডিরেকশন আছে। তবে সেটি নির্ভর করবে আদালতের ওপর। আদালতের কার্যকারিতার ওপর। আদালত যদি মনে করেন, তাহলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার কাজ করতে পারবেন।’

এর আগে গত ২৫ মার্চ এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে আজকের দিন পর্যন্ত জামিন বর্ধিত করেছিলেন আদালত। গত ২৮ মার্চ সর্বশেষ শুনানিতে তাকে আদালতে হাজির করার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে হাজির করা হয়নি বলে জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এ মামলায় আজ অপর আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পক্ষে অব্যাহত যুক্তিতর্কের বাকি অংশ শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তারপর মনিরুল ইসলামের যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হবে। দুই আসামির যুক্তিতর্ক শেষ হলে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

মামলার আরেকজন আসামি হারিছ চৌধুরী পলাতক রয়েছেন। প্রায় তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয় বকশিবাজারের অস্থায়ী আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান। এ মামলার অপর আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। রায় ঘোষণার পর থেকেই পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া।

রায়ের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে জামিনও চান বিএনপির চেয়ারপারসন। পরে খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ। শুনানি শেষে আদালত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে এ মামলায় চার মাসের জন্য অন্তবর্তীকালীন জামিন দেয় আদালত। ১৩ মার্চ, খালেদার জামিন স্থগিত চেয়ে চেম্বারে আবেদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ১৪ মার্চ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ স্থগিত করে এবং আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ১৪ মার্চ দিন নির্ধারণ করে চেম্বার আদালত।

এরপর ১৪ মার্চ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ১৮ মার্চ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল করতে আদেশ দেওয়া হয়।

১৮ মার্চ, সোমবার এ মামলার শুনানি করে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল গ্রহণ করে আপিল বিভাগ। পাশাপাশি আগামী ৮ মে পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে আদালত।    

প্রিয় সংবাদ/শান্ত  

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
শহিদুলের ডিভিশন বিষয়ে আপিলের শুনানি ১ অক্টোবর
আমিনুল ইসলাম মল্লিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বিএনপিকে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে মওদুদের নির্দেশ
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় রিটের শুনানি ১ অক্টোবর
আমিনুল ইসলাম মল্লিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোহরাওয়ার্দী‌তে জনসভার নতুন তারিখ ঘোষণা বিএনপির
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সিলেট জেলা বিএনপি সম্পাদক কারাগারে
আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
চালু হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম বিরতিহীন ফ্লাইট
প্রিয় ডেস্ক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
‘কারাগার থেকে খবর পাঠিয়েছেন খালেদা জিয়া’
‘কারাগার থেকে খবর পাঠিয়েছেন খালেদা জিয়া’
যুগান্তর - ২ দিন, ১৬ ঘণ্টা আগে
খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ : রিজভী
খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ : রিজভী
নয়া দিগন্ত - ৩ দিন, ১ ঘণ্টা আগে
ট্রেন্ডিং