গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

গ্রাম পুলিশ: শূন্য হাতেই যাদের পথচলা

সরকার কয়েক বছর থেকে গ্রাম পুলিশের অবসরকালীন ভাতা ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করলেও তা সঠিকভাবে তারা পাচ্ছেন না।

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৫১ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২১:৩২


গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

(প্রিয়.কম) গ্রামে যারা বড় হয়েছেন বা এখনো আছেন, তাদের অনেকেরই ‘গ্রাম পুলিশ’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এই বাহিনীর সদস্যদের চৌকিদার ও দফাদার বলেই ডাকা হয়ে থাকে। গ্রামে কোনো বিচার হলে বা অপরাধীকে ধরতে তাদেরই প্রথম ডাক পড়ে। তৃণমূল পর্যায়ের এ বাহিনীর পোশাক আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই বললেই চলে। আর সুযোগ-সুবিধাই পায় খুবই সামান্য।

এই গ্রাম পুলিশ সদস্যরা গ্রামের মানুষের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে নিজেরা কতটুকু সুবিধা পান, কীভাবে চলে তাদের সংসার তা অনেকেরই অজানা। দৈনন্দিন জীবনে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হন তারা, তারও খোঁজ জানে না অনেকে। তাদের জীবনের অজানা দুঃখ-কষ্টের গল্পগুলো নিয়ে প্রিয়.কমের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের চতুর্থ পর্ব প্রকাশিত হলো।

গ্রাম পুলিশ সদস্যরা সারা জীবন ইউনিয়নের মানুষের বিভিন্ন কাজে সেবা দেন। বিভিন্ন গ্রামে নিরাপত্তা দেওয়া, বিচার-আচার, আসামি ধরিয়ে দিতে হলেও তাদের ডাক পড়ে। এ ছাড়াও কোনো অপমৃত্যু হলেও তারাই প্রথমে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ জন্য অবশ্য তারা পান না কোনো বাড়তি বেতন-ভাতা। সব মিলিয়ে শেষ জীবনে অবসরে যাওয়ার সময় এই মানুষগুলোকে শূন্য হাতেই চলে যেতে হয়।

সরকার কয়েক বছর থেকে গ্রাম পুলিশের সদস্যদের অবসরকালীন ভাতা ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করলেও তা সঠিকভাবে তারা পাচ্ছেন না। অবসরকালীন টাকা দুই-একজন পেলেও তার জন্য ধরনা দিতে হয় প্রশাসনের এক দরজা থেকে আরেক দরজায়। আর এতে কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে সেই টাকার আশা ছেড়ে দেন। আর কারো কারো নামে টাকা বরাদ্দ হলেও সেই টাকা না পাওয়ার বিস্তর অভিযোগও রয়েছে। কেউ আবার সেই টাকা না পেয়ে অভিমানে দেশও ছেড়েছেন। কারো আবার মৃত্যুর পর তার ছেলেমেয়েরাও পাননি সে টাকা। চাকরি শেষ করার পর হয়তো কোনো চেয়ারম্যান খুশি হয়ে চৌকিদার ও দফাদারকে লুঙ্গি ও শার্ট দেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে যে ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে, তা পেতেও পদে পদে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়।

অবসরকালীন টাকা না পেয়ে অনেকে অভিমান করে পাশের দেশে পাড়ি দিয়েছেন—এমন ঘটনাও ঘটেছে। তেমনই একজন খুলনার দিঘলিয়ার বারাকপুর ইউনিয়নের ফটিক চন্দ্র রায়। ২০১৩ সালে অবসরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু টাকা না পেয়ে স্ত্রী ও ছেলে সন্তানকে নিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানেই তিনি মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

কেউ কেউ দেশে থেকেও পাননি সে টাকা। রেখে যাওয়া সন্তানদেরও ভাগে জোটেনি সে টাকা। এমন একজন অভাগা হলেন দিঘলিয়ার ফটিকের ইউনিয়নের লাখোহাটি গ্রামের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম রসুল। তিনি তার চার মেয়ে রেখে গেলেও সন্তানরা পাননি সেই টাকা। তাহলে তার অবসরকালীন ভাতার টাকা কে নিয়েছে কিংবা কারা উত্তোলন করেছে সে টাকা তাও জানেন না তার সন্তানরা।

গোলাম রসুলের পাশের গ্রামের চৌকিদার জিয়া জানান, গোলাম রসুলের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী অন্যের কাছে হাত পেতে খান। মেয়েরা বাবার টাকার জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তখন বলা হয়েছিল, টাকার খসড়া বরাদ্দ হয়েছে কিন্তু অনুমোদন হয়নি। এরপর যত দূর জানি, তারা এক টাকাও পায়নি।

দেশ ছেড়ে যাওয়া ফটিক ও গোলাম রসুলের বিষয়টি জানার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল বারাকপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গোলাম রসুল তার অবসরকালীন ভাতার জন্য ইউএনওর (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে পরে পেয়েছিল কি না, তা বলতে পারব না।’

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরিফুল ইসলাম জানান, তার বাবা ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করে পরের বছর মারা যান। কিন্তু আজও তিনি ও তার পরিবার বাবার অবসরকালীন ভাতার ৫০ হাজার টাকা পাননি। এ টাকা তারা আদৌ পাবেন কি না তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

আরিফুল বলেন, ‘কতবার চেয়ারম্যান, ইউএনও স্যার ও ডিসি স্যারের কাছে গেলাম কিন্তু কই তারা খালি কয়, টাকা আসবে। টাকা তো আইসে নাই।’

আরিফুলের বাবা যে বছর অবসরে যান সেই বছরই ধামরাই উপজেলার হাটকুসুরা গ্রামের জালাল উদ্দিন চাকরি থেকে অবসরে যান। তারপর বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিলেও মেলেনি তার সেই অবসরকালীন টাকা। কেউ কেউ নানা জায়গায় ধরনা দিয়েছেন তবুও মেলেনি টাকা।

জামাল উদ্দিনের টাকা তুলে দেওয়ার জন্য গ্রাম পুলিশ লালমিয়া প্রায় দুই বছর বিভিন্ন অফিসে ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি। লাল মিয়া প্রিয়.কমকে বলেন, ‘জামাল চাচাটা অনেক বৃদ্ধ মানুষ। আশা করছিল টাকা পাইলে সে কিছু করবে কিন্তু সেই টাকাই আজও পাইল না। তার মতো তিনি তার গ্রামের চারজন গ্রাম পুলিশের অবসর ভাতা তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করেছেন কিন্তু কাউকে সেই টাকা তুলে দিতে পারেননি। আবার কারো মৃত্যুর পরও তার পরিবার টাকা পাচ্ছেন না এ রকম অভিযোগও অহরহ পাওয়া যায়।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার ৩ নং চরভদ্রাসন ইউনিয়নের ফাজিলখার ডাঙ্গি গ্রামের চৌকিদার মৃত জালাল খানের পরিবারও এখনো কোনো টাকা পাননি। অথচ তার মৃত্যুর পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে।

নিহত জামালের গ্রামের চৌকিদার মোক্তার হোসেন জানান, তার মৃত্যুৃর পর পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। জালালের পরিবার তার অবসরকালীন টাকা কবে পাবেন, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা গ্রাম পুলিশদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের চাকরি জীবনে সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। কিন্তু অবসরে গেলে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার নিয়ম করেছে সরকার। এ নিয়মটি কয়েক বছর আগে চালু হলেও এখন পর্যন্ত যারা অবসরে গেছেন, কেউই টাকা পাননি। মাত্র তিন হাজার টাকায় চাকরি করার পর শেষ জীবনে ৫০ হাজার টাকা তারা পাবেন বলে অনেকে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু যারা অবসরে গেছেন, তারা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও পাননি সেই টাকা। তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, অবসরের পর জেলা প্রশাসনে গেলে টাকা আসবে। টাকা পাওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কিন্তু কিছুদিন পরপর খোঁজ নিলে সেই টাকার আর হদিস মেলে না। তা ছাড়া তাদের পাওনা টাকাটা কখনো দেওয়া হবে কি না, তা-ও পরিষ্কার করে বলা হয় না।

বরিশাল জেলার সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বিন্দামানিক গ্রামের ৪ নম্বর ওযার্ডে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে অবসরে যান আলী আহাম্মদ। কিন্তু এখনো সেই অবসর ভাতা তিনি পাননি। এ কারণে এখন অন্যের বাড়িতে কামলা দিয়ে জীবন কাটে তার।

অন্যদিকে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার চৌকিদার মোক্তার হোসেন জানান, তার পাশের গ্রাামের জালাল খান নামে এক চৌকিদার সম্প্রতি মারা গেছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকেই তার পরিবারের সদস্যরা অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটাচ্ছে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় নিহতের স্ত্রী।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘তারা পেনশনের টাকা কী করে পাবে? গ্রাম পুলিশের জন্য কোনো ট্রাস্টই গঠন করা হয়নি। এ কারণে তারা অবসরে গেলেও নামমাত্র যে টাকাটা পাওয়ার কথা, তা-ও পাচ্ছেন না। যেহেতু এটি একটি বাহিনী, এ জন্য তাদের সবকিছুকে নিয়মের মধ্যে আনার কথা সরকারকে ভাবতে হবে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে বেশি কিছু জানি না। বিষয়টি দেখেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।’

স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘তারা তো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু টাকা-পয়সা পায়। আর তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য তো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে একটা প্রস্তাব আসতে হবে। ইউনিয়ন কাউন্সিল কত দেবে সেটা আগে তারা ভাবুক, তারপর আমরা ভাবব। কারণ আমাদের তো একটা প্রসেস ফলো করতে হবে।’

প্রিয় সংবাদ/কামরুল/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
সরকারকে ‘সোজা রাস্তায়’ আসার আহ্বান ফখরুলের
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২০ অক্টোবর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
ট্রেন্ডিং