(প্রিয়.কম) বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঠ চুকিয়ে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন অমিত (ছদ্মনাম)। ছাত্র জীবনেও একাধিক প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন সাংবাদিকতা করেছেন। বর্তমানে দেশের প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় সংবাদপত্রে কর্মরত আছেন। নিয়োগের সময় কথা হয়েছে, ছয় মাস কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী চূড়ান্ত নিয়োগ পাবেন। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি, ফলে ওয়েজবোর্ডের বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তার কাছে ‘সোনার হরিণ’।

একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তিনি সাংবাদিকতা ছেড়েছেন। এরকম ঘটনা আরও অনেক সংবাদমাধ্যমেই রয়েছে। কেউ কেউ চূড়ান্ত নিয়োগের আশায় এখনও সাংবাদিকতা করছেন, আবার কেউ কেউ ইস্তফা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডের গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দিলেও অন্যদের দিচ্ছে না। তবে সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কর্মরত সব সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড দেওয়া হচ্ছে।

২০১২ সালে ঘোষিত অষ্টম ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী, ঢাকার ৪৪টি বাংলা দৈনিক, ১৫টি ইংরেজি দৈনিক, মফস্বলের ৩২টি বাংলা দৈনিক অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেছে বলে দাবি করে থাকে। এসব পত্রিকা বিভিন্ন মূল্যে সরকার থেকে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক সাংবাদিকই অভিযোগ করছেন, তারা এখনও চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি। ফলে ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন ও কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান না। মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন পান শুধু।

শোষণের শিকার এসব সাংবাদিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে সরাসরি মুখও খুলতেও সাহস পান না। এই সংকট প্রায় সব সংবাদপত্রে বিদ্যমান দাবি করে দৈনিক সমকালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংবাদকর্মী প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্র হাউজে এই সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসে না খুব একটা।’

মালিকপক্ষ আর সিনিয়র সাংবাদিকদের কারণেই এমনটা হয়ে থাকে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সিনিয়র সাংবাদিকরা মালিকপক্ষের কাছে ভালো সাজার কারণে জুনিয়রদের বেতন বাড়ে না। মানে ওয়েজবোর্ডে আসে না। তারা মালিকপক্ষকে জানায়, অনেক কম বেতনে আমরা ছেলেদের দিয়ে কাজ করাতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় আবার কর্তৃপক্ষের মানসিকতার বা চাওয়ার সাথে সিনিয়রদের আপোষ করতে হয়। কিন্তু এমন বিষয় কম। মূলত প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুযোগ কাজে লাগায়।’

দৈনিক সমকালে কর্মরত আরেক সাংবাদিক বলেন, ‘আসলে সাংবাদিক নেতারা আই-ওয়াশ করার জন্য আন্দোলন করেন। কিন্তু নিজ প্রতিষ্ঠানে ওয়েজবোর্ড পাওয়ার জন্য আন্দোলন করা যায় না। উপায় নেই। এমন বিষয়ে আন্দোলন করলে তার আর চাকরি থাকবে না। এখানে এসব সাংবাদিকরা অসহায়। চাকরি বয়স বছর পার হলেও ছয় মাসের প্রতিশ্রুতি শেষ হয় না।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েজবোর্ড পাওয়া বা দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ঘেঁষা কিছু সাংবাদিক কাজ করেন। তারা চান, যত কম বেতনে সাংবাদিকদের খাটানো যায়। নিজেদের চাকরি স্থায়ী বা পাকাপোক্ত করার জন্যই তারা মালিকপক্ষের সাথে তোষামুদী করেন।’

এ বিষয়ে সমকালের মানববসম্পদ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে রেজা নামের একজন ফোন রিসিভ করেন। তবে তিনি ওয়েজবোর্ড বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

ওয়েজবোর্ড নিয়ে সমকালের সাংবাদিকদের মতের সাথে সহমত পোষণ করেন দৈনিক যুগান্তরে কয়েক বছর ধরে কর্মরত এক সাংবাদিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সংবাদকর্মী বলেন, ‘আসলে এখানে কিছু বলাও যায় না, আবার সইতেও পারা যায় না। কারণ কোনো সাংবাদিক নিজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারে না। এমন কিছু হলে তো তার চাকরি থাকবে না। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাভবান হয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটা হাউজে মালিকের অনুগত এক শ্রেণির সাংবাদিক থাকেন। তারা এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা চান, কীভাবে কম খরচে প্রতিষ্ঠান চালানো যায়। তারা মালিকের কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করেন। আগামীতে যে ওয়েজবোর্ড আসবে সেটাতেও তারাই লাভবান হবেন।’

অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে-এমন বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে খোঁজ করলে ২০ শতাংশের বেশি ওয়েজবোর্ডের বাইরে থাকা সংবাদকর্মী পাওয়া যাবে বলে মনে করেন এই সংবাদকর্মী। তিনি বলেন, ‘তারাও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। চূড়ান্ত নিয়োগ এবং ওয়েজবোর্ডের সুযোগ-সুবিধার প্রতীক্ষায় রয়েছেন। কবে তার প্রমোশন হবে, ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন পাবেন? অপেক্ষায় থাকেন কবে ছয় মাস শেষ হবে? আর ওয়েজবোর্ড মিলবে!’

‘লোকবল ছাঁটাই আরেকটি বিষয়। ওয়েজবোর্ড দিলে ছাঁটাই করতে অনেক সমস্যা হয়। এই কারণে প্রতিষ্ঠান ওয়েজবোর্ড দিতে চায় না। ওয়েজবোর্ড দিলে একজন সাংবাদিককে ছাঁটাই করলে অনেক প্রক্রিয়া মাথায় রাখতে হয়’, যোগ করেন যুগান্তরের ওই সাংবাদিক।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীও এমন সংকটের কথা জানিয়েছেন, ‘আইনগতভাবে সিদ্ধ হলেও ওয়েজবোর্ড পাচ্ছেন না সাংবাদিকরা, পাওনা পাওয়ার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। চাকরির ন্যূনতম শর্তানুযায়ী নিয়োগপত্র তারা পাচ্ছেন না। শ্রম আইনের নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি চলে যাওয়ার পর পাওনা টাকা পর্যন্ত তারা পাচ্ছেন না।’

ওয়েজবোর্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন দৈনিক আমাদের সময়ের সাবেক এক সাংবাদিক। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘একবার ব্যাংকে বেতন তুলতে গিয়ে দেখি, আমার ব্যাংক হিসাবে কয়েক হাজার টাকা বেশি। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম এটা শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, অফিসের সবার। কারও ১০ হাজার, কারও এর চেয়ে বেশি টাকার স্যালারি একাউন্টে জমা হয়েছে। পরে অফিস থেকে জানানো হলো, আপনাদের কাছে ভুলে বেশি টাকা গেছে। টাকা ব্যাংক থেকে তুলে সবাই সম্পাদকের কাছে জমা দিবেন।’

‘আসলে বিষয়টা ভুল ছিল না। পরে জানলাম, আমাদের সময় ওই মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে অফিস। এবং সেলারির স্টেটমেন্টের মাধ্যমে তারা প্রমাণ দেয় যে, প্রতিষ্ঠানটি অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করছে। সাংবাদিকদের বেতনভাতা ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে’, জানান ওই সাংবাদিক।

তবে এ বিষয়ে আমাদের সময়ের প্রসাশন বিভাগ থেকে দাবি করা হয়, তারা পুরোপুরি ওয়েজবোর্ড ফলো করেন।

দৈনিক ইত্তেফাকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এক সাংবাদিক এখনও ‘চুক্তিভিত্তিক’ নিয়োগে কাজ করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ছয় মাস পর ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়ার কথা হয়। পরে সেটা বাস্তবায়ন হয় না। কয়েক বছর পার হলেও হয় না। অনেক সাংবাদিক আবার এটা মেনে নিয়েই সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন।’

তবে এ ক্ষেত্রে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রেডে প্রতিটি সংবাদকর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করে সংবাদমাধ্যমগুলো।

এ বিষয়ে ইত্তেফাকের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এমন তথ্য পেতে নিয়ম-কানুন মেনে আসতে হবে। আর আমাদের অফিসে সব নিয়ম মেনেই হয়। ওয়েজবোর্ড অনুসরণ করা হয়। সরকারও যাচাই-বাছাই করে আমাদের ছাড়পত্র দিয়েছে। অনিয়ম হলে তো সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠান পেত না।’

এদিকে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে সরকার। এরপর থেকেই নতুন করে বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো। এমন দাবির প্রেক্ষপটে নবম ওয়েজ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়।

আরও পড়ুন
>> সাংবাদিকদের মানবেতর জীবন-যাপনের শেষ কোথায়?
>> ওয়েজবোর্ডেও আশা দেখছেন না টেলিভিশন সাংবাদিকরা

প্রিয় সংবাদ/রিমন