গ্রাফিক্স: প্রিয়.কম

চলমান অভিযান নিয়ে কী ভাবছেন বিশ্লেষকরা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরাধ দমনে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

তানজিল রিমন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ মে ২০১৮, ২২:৩৪ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৫:৩২
প্রকাশিত: ২৮ মে ২০১৮, ২২:৩৪ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৫:৩২


গ্রাফিক্স: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) চলতি মাসে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর থেকেই বন্দুকের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। অভিযান শুরুর পর বন্দুকের গুলিতে ১৩ দিনে ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, নিহতরা সবাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরাধ দমনে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে, যেন বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

১৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বন্দুকের গুলিতে ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৮১ জন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছেন।

মাদকবিরোধী অভিযানে নিহতদের মধ্যে দু-একজনের পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে পুলিশের কাছে মারা যাওয়ার খবর পেয়েছেন। কক্সবাজারের টেকনাফে নিহত এক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কোনো মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নেই বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ। যদিও র‌্যাব বলছে, ওই কাউন্সিলর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন।

সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে।

মাদকবিরোধী অভিযান জরুরি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) ড. এম. এনামুল হক। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান দরকার ছিল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে ভালো করেছেন। যদি আরও আগে বলতেন, তাহলে আরও ভালো হতো। যা-ই হোক, শুরু হয়েছে, ভালো হয়েছে।’

কিন্তু যত ভালো উদ্দেশ্যই হোক না কেন, দেশের আইন সবার জন্য সমান এবং আইন মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এনামুল হক।

পুলিশের সাবেক এই আইজি বলেন, ‘যেহেতু আমরা জাতিসংঘের নিবন্ধিত একটা দেশ, জাতিসংঘের যেসব বিধি-বিধান আছে, সেগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে।’

অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি করা বন্দুকযুদ্ধ প্রসঙ্গে ইন্টারপোলের নির্বাহী কমিটির একসময়ের সদস্য এনামুল হক বলেন, ‘অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি, অভিযান আমাদের দরকার ছিল, জাতির বৃহত্তর স্বার্থের জন্য এ ধরনের অভিযান দরকার। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা প্রত্যেকেই আইনের অধীনে বাস করি। আমাদের দেশের সংবিধান, আমাদের যে বিধিবদ্ধ ফৌজদারি, দেওয়ানি ও সাক্ষ্য আইন আছে, বিশেষত এই তিনটা আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ যে আইন আছে, এটার মধ্যে আমাদের বসবাস করতে হবে।’

অভিযান প্রয়োজন, তবে অপরাধীকে বিচারের সুযোগ দিতে হবে বলে মনে করছেন এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘মানুষকে বিনাবিচারে মারা উচিত নয়। যেকোনো অপরাধীকেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ দিতে হবে, সুযোগ বেশি দিনও হতে পারে, কম দিনও হতে পারে। এখন যারা মারা যাচ্ছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা মাদকের সঙ্গে জড়িত। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথাকে সঠিক ধরেও নিই, তবু বলব আইনের বিধি-বিধান মেনে চলা উচিত।’

‘প্রয়োজনবোধে ১০ জন দোষী লোক খালাস পাবে, কিন্তু একজন নির্দোষ লোকও যেন শাস্তি না পায়—তা নিশ্চিত করতে হবে, এটাই আইনের মোদ্দাকথা’, বলেন বাংলাদেশ আইন কমিশনের সাবেক সদস্য ড. এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘সর্বোপরি মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবারই সচেতনতার দরকার আছে। পরিবার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে, সন্তানরা যেন বিপথে না যায়।’

এই বন্দুকযুদ্ধকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দাবি করেন, এর মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না, অতীতেও হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে? বিচারবহির্ভূত এই হত্যায় কোনো সমস্যার সমাধান কি হয়েছে? বিএনপির আমলে ২০০৪ সালে অপারেশন ক্লিন হার্টে বহুত ক্রসফায়ার হয়েছিল, কোনো সমস্যার সমাধান কি হয়েছিল? আমাদের রোগটা কী চিহ্নিত করতে হবে, কারণটা চিহ্নিত করতে হবে এবং রোগটার চিকিৎসা করতে হবে।’

বাম থেকে এনামুল হক, বদিউল আলম মজুমদার, নুরুল হুদা, আব্দুর রশিদ, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। ছবি: সংগৃহীত

মাদক সমস্যা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। আর সরবরাহ বন্ধ করতে হলে যারা রাঘব-বোয়াল আছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়, বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান বদিউল আলম মজুমদার।

অন্যদিকে পুলিশের সাবেক আইজি নুরুল হুদা মনে করেন, মাদকের ভয়াবহতা কমাতে এই অভিযান একটি পথ মাত্র এবং এতে মাদকের ভয়াবহতা কমবে। তবে এর বাইরে আরও কাজ করার সুযোগ আছে।

নুরুল হুদা বলেন, ‘এই অভিযানের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। এতে মাদকের ব্যবহার অনেকটাই কমে আসবে।’

অভিযানের পাশাপাশি সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করাসহ নির্ভুল তালিকা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন সাবেক আইজি। তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসায় যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে, অর্থায়ন কারা করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

মাদকের মধ্যে ইয়াবা কক্সবাজার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ইয়াবার সরবরাহ কেন্দ্রকে উৎপাটন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন নুরুল হুদা।

এমনটা মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদও। তিনি বলেন, ‘ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে। এটা বন্ধ করতে হলে কক্সবাজারে আরও কঠোর হতে হবে। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত অপারেশন করতে হবে। অভিযান টেকসই হতে হবে।’

মাদকবিরোধী অভিযান সাধারণ মানুষ গ্রহণ করছে বলে দাবি করেন আব্দুর রশিদ। তিনি মনে করেন, মাদক ব্যবসায়ীদের কারণে প্রতিটি এলাকার যুবসমাজ যখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন এই অভিযানকে সবাই ভালোভাবে নিয়েছে। এই কারণে সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করছে না।

এই অভিযানে যেন কোনো নির্দোষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন আব্দুর রশিদ। অভিযান যেন বিতর্কিত না হয় সেদিকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কৌশলী সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মনে করছেন তিনি।

সাধারণ মানুষ এর শিকার হলে বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দীর্ঘ হলে এই অভিযান নৈতিক অবস্থান হারাতে পারে—এমনটা জানিয়ে আব্দুর রশিদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এই অভিযানের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে না পারলে সবকিছু প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অভিযানের ফলাফল সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্ট হতে হবে। অভিযানের অগ্রগতি স্পষ্ট হলে এতে সমর্থন আরও বাড়বে।’

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবার ও অভিভাবকসহ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে মন্তব্য করেন আব্দুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘মাদকমুক্ত বাংলাদেশের জন্য জনসচেতনতার বিকল্প নেই।’

অন্যদিকে কোনোভাবেই এই ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে সমর্থন করা যায় না বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এসব কোনো কিছু আইনি প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। এভাবে কোনো অভিযান সফল হয় না।’

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘দেশে আইন আছে, একটা প্রক্রিয়া আছে, সে অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু তা না করে কাউকে মেরে ফেলার কোনো এখতিয়ার পুলিশের নেই।’

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী