(প্রিয়.কম) নবম ওয়েজবোর্ড গঠন ও বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার সাংবাদিকরা। তারা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সাংবাদিকদের বেতন এক জায়গাতেই রয়েছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার বেতন বাড়লে, সাংবাদিকদের বেতন বাড়বে না কেন? এমন প্রশ্নও তুলেছেন সাংবাদিকরা।

অনেক দিন থেকেই নবম ওয়েজবোর্ড গঠনে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচিসহ বিভিন্নভাবে দাবি জানানো হচ্ছে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে। দাবির মুখে ইতোমধ্যে নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ আগস্ট বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াব-এর প্রতিনিধিদল। তবে বৈঠক শেষে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে বেশ উত্তপ্ত বাক্যালাপ করেন অর্থমন্ত্রী। যা পরে সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানানো হয় সাংবাদিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে।

অষ্টম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালে। সম্পাদককে বিশেষ গ্রেডে রেখে শিক্ষানবীশ সাংবাদিক থেকে শুরু করে বার্তা সম্পাদক পর্যন্ত মোট ৬টি গ্রেড করা হয়।  নির্বাহী সম্পাদক থেকে বিশেষ প্রতিনিধিরা গ্রেড-১, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক থেকে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গ্রেড-২, সহ-সম্পাদক থেকে স্টাফ রিপোর্টার গ্রেড-৩, শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক থেকে শিক্ষানবিশ প্রতিবেদক গ্রেড-৪ এবং শিক্ষানবিশ সম্পাদনা সহকারী পাবেন গ্রেড-৫। 

শিক্ষানবীশ প্রতিবেদক গ্রেড-৪ অনুযায়ী শুরুতে মূল বেতন পান ১২,৬০০ টাকা৷ এ ছাড়া ঢাকায় কর্মস্থল হলে বাড়িভাড়া হিসেবে ৮ হাজার ৮২০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ২ হাজার ৫০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা দেড় হাজার টাকা, প্রতিবেদকের জন্য বিশেষ যাতায়াত ভাতা হিসেবে ৩ হাজার টাকা; মোট ২৮ হাজার ৪২০ টাকা পান।

এ ছাড়া মূল বেতন হিসেবে সম্পাদকরা ৩৫ হাজার ৮৭৫ টাকা, নির্বাহী সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও বিশেষ প্রতিনিধিরা ৩১ হাজার ৮৫০ টাকা, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকরা ২৪ হাজার ১০৬ টাকা, নিজস্ব প্রতিবেদকরা ১৫ হাজার ৯২৫ টাকা পান৷ সব ভাতা সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে একজন সম্পাদক ৮০ হাজার টাকার বেশি পান না। অন্যদিকে সরকার ২০১৫ সালে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করে। এ ছাড়া দ্বিগুণ হয়েছে জাতীয় সংসদের স্পিকার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বেতন-ভাতা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বেতন ভাতা। তা সত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে সাংবাদিকদের নবম পে-স্কেলের বিষয়টি।

এ বিষয়ে ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটির (ডিআরইউ) অর্থ সম্পাদক মানিক মুনতাসির প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘অষ্টম ওয়েজবোর্ড করা হয়েছে ২০১৩ সালে। এই টাকায় সেসময় মোটামুটিভাবে খেয়ে-পরে বাঁচা গেলেও এখন সেটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। দেশে যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, এক কথায় মূল্যস্ফীতি হচ্ছে তাতে ৫ বছর আগের বেতনে জীবনধারণ করাটা কতটা কষ্টকর তা সহজেই অনুমেয়।’

‘এ ছাড়া পাঁচ বছরে একজন ব্যক্তির পরিবারের সদস্য বাড়ে, কারও একটা সন্তান থাকলে এখন তার দুইটা হতে পারে। সন্তানের স্কুলের খরচসহ পরিবারের ভরণপোষণ খরচ নিশ্চয়ই আগের মতো নাই এবং সেটা দিন দিন বাড়ছেই। পাঁচ বছর আগে আমরা গরুর মাংস কিনতাম ৩০০ টাকায়, এখন সেটা স্বপ্ন বা কোনো সুপারশপে ৫২০ টাকায়ও পাওয়া যায় না’, বলেন তিনি।  

মানিক মুনতাসির আরও বলেন, ‘কেউ যদি সরকারি চাকরি, ব্যাংক বা ভালো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সেখানে কিন্তু বছর বছর প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কানুন-অনুযায়ী ইনক্রিমেন্ট ও বেতন-ভাতা আপডেট করা হয়। কিন্তু এ আমাদের দেশে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেটা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে একজন সাংবাদিকের পক্ষে খেয়ে-পরে মোটামুটি জীবনযাপন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা এবং তার বাস্তবায়ন করাটা সময়ের দাবি।’

‘সবচে দুঃখের বিষয়টা হলো হাতেগোনা কয়েকটা সংবাদপত্র ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাতেই অষ্টম ওয়েজবোর্ডই এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। সেসব পত্রিকার সাংবাদিকদের অবস্থা আরও বেগতিক। তাই সেসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত অষ্টম ওয়েজবোর্ডটা এখনই বাস্তবায়ন করাটা জরুরি, পরে নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষিত হলে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে দেশ যে জায়গায় ছিল, আজ সে অবস্থায় নাই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে রিকশা ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সবকিছু মিলিয়ে সাংবাদিকদের ব্যয় বেড়েছে কিন্তু আয় বাড়েনি। এতে জীবনযাপনের নিন্ম স্তরে নেমে গেছে। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে, বিচারক ও সাংসদদের বেতন বেড়েছে, তাহলে সাংবাদিকদের বেতন কেন একই জায়গায় থাকবে! তাই নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েজবোর্ডের বিষয়টি এখন আটকে আছে মালিকপক্ষের কারণে। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে সেদিন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াব-এর প্রতিনিধিদল। কিন্তু বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সাংবাদিকদের জন্য অবমাননাকর। আমরা এ বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। সেখানে তথ্যমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মালিকপক্ষ অর্থমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছে। আমাদের দাবি, মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী প্রকৃত অবস্থাটা নিরূপণ করে নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের উদ্যোগকে দ্রুত বাস্তবায়ন করবেন।’

‘মাননীয় রাষ্ট্রপতি আমাদের দাবির ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। তাই যত দ্রুত সম্ভব নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে চলমান সংকট নিরসন করা যাবে, ততোই আমাদের জন্য ভালো, দেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য ভালো হবে’, যোগ করেন বাদশা।                                 

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ প্রতিনিধি ছাইফুল ইসলাম শামীম প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘নিয়ম হলো পাঁচ বছর পর পর ওয়েজবোর্ড আপগ্রেড করা। কিন্তু সপ্তম ওয়েজবোর্ড কার্যকর করা হয় ১২ পরে, আর এখন অষ্টম ওয়েজবোর্ড কার্যকর করা হয়েছে তাও পাঁচ বছর হয়ে গেছে। সে হিসেবে সাংবাদিকদের একটি ওয়েজবোর্ড ইতোমধ্যে মিস হয়েছে। তার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, পাঁচ বছরে দেশের মানুষের জীবনধারণের ব্যয়ভার বেড়েছে, এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকরা কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করাটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।’

‘বেতনের বৈষম্য ছাড়াও একজন সরকারি কর্মকর্তা গাড়ি, বাড়িসহ অন্যান্য যেসব রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন, একজন সাংবাদিক কিন্তু তা পান না। আর্থিক মূল্য বিচার করলে একজন সাংবাদিক একজন সরকারি কর্মকর্তার চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগ সুযোগ-সুবিধা পান’, বলেন এই সাংবাদিক।

অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেদিন সংবাদপত্রের মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কথাগুলো বলেছেন। তিনি আসলে পুরো বিষয়টি ঠিকমতো জানেন না। মালিকদের পক্ষ থেকে যা বোঝানো হয়েছে, তিনি তাই বলেছেন। এটা ঠিক না।’

‘তবে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একটা বিষয়ে অনেকেই একমত। অনেকেরই প্রশ্ন আছে যে, ১৫-২০টা পত্রিকা ছাড়া বেশিরভাগ মানসম্মত না। কিন্তু সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের, না জেনে, না দেখে যাকে তাকে পত্রিকার ডিক্লারেশন দেওয়াটাও উচিত না। সংবাদপত্রের মান রক্ষায় ও সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। এতে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবে’, যোগ করেন ছাইফুল ইসলাম। 

অন্যথায় সাংবাদিকদের মধ্যে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।       

১৩ আগস্ট রোববার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মালিকদের প্রতিনিধি না পাওয়ায় তা গঠন করা যাচ্ছে না। মালিকদের এ বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

গত ১৯ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের বিষয়ে শুরু থেকেই ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বোর্ড গঠনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। গত বছরের অক্টোবর থেকেই ৯ম ওয়েজবোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অংশীজনদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করে ওয়েজবোর্ডের চেয়ারম্যান ও বোর্ড গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে প্রতিনিধি মনোনয়ন চাওয়া হয়। ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. নিজামুল হককে বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অভ্ নিউজপেপার প্রেস ওয়ার্কার্স ও বাংলাদেশ সংবাদপত্র কর্মচারি ফেডারেশন থেকে প্রস্তাবিত প্রতিনিধিদের নামও পাওয়া গেছে। নিউজপেপারস ওনার্স এসোসিয়েশন অভ্ বাংলাদেশ (নোয়াব)-ও অচিরেই তাদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবে বলে জানিয়েছে।’

‘নোয়াব’ এর প্রতিনিধির নাম পাওয়া মাত্রই নবম ওয়েজবোর্ড গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও কার্যকর হবে বলে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন
>> সাংবাদিকদের মানবেতর জীবন-যাপনের শেষ কোথায়?
>> ওয়েজবোর্ডেও আশা দেখছেন না টেলিভিশন সাংবাদিকরা
>> সাংবাদিকদের ছয় মাসের অপেক্ষা আর শেষ হয় না

প্রিয় সংবাদ/রিমন