রবিবার দেশব্যাপী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ছবি: স্টার মেইল

‘মেধাবীর সংখ্যা রকেটের গতিতে মহাশূন্যে গিয়ে ভাসছে’

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দেশে মেধাবীর সংখ্যা রকেটের গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হতে হতে ২০১৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক জিপিএ-৫-এর মধ্য দিয়ে মুক্তিবেগ কাটিয়ে মহাশূন্যে মোটামুটি একটা স্থবির অবস্থায় ভাসছে৷

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ০৭ মে ২০১৮, ১৬:১৫ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:৩৩


রবিবার দেশব্যাপী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ছবি: স্টার মেইল

বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড মূলত ২০০১ সালেই জিপিএ পদ্ধতি প্রচলন করে৷ এর আগে ছিল সনাতন তথা বিভাগ পদ্ধতি- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ। সাড়ে সাতশ নম্বরের বেশি পেলে তাকে বলা হতো স্টার মার্কস৷ সে সময় সব বিষয়ে আশির উপরে নম্বর তোলা ছিল মোটামুটি অসম্ভব ব্যাপার৷ ডিজিটাল যুগে সেই সর্বনিম্ন আশিকে ধরা হয় জিপিএ-৫৷

সনাতন যুগে সব বিষয়ে আশি পাওয়া অসম্ভব হলেও ডিজিটাল যুগে সলিম উদ্দিন-কলিম উদ্দিনের যেকোনো টাইপের ছেলে-মেয়েগুলো পরীক্ষা দিলেও ‘আই অ্যাম জিপিএ-৫’ হয়ে যায়৷

বাংলাদেশে এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের একটু ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করি৷ বাম দিকে সন এবং ডান দিকে ওই সনে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবীর সংখ্যা৷

২০০১ সালে ৭৬ জন

২০০২ সালে ৩৩০ জন

২০০৩ সালে ১৩৮৯ জন

২০০৪ সালে ৮ হাজার ৫৯৭ জন

২০০৫ সালে ১৫ হাজার ৬৩১ জন

২০০৬ সালে ২৪ হাজার ৩৮৪ জন

২০০৭ সালে ২৫ হাজার ৭৩২ জন

২০০৮ সালে ৪১ হাজার ৯১৭ জন

২০০৯ সালে ৪৫ হাজার ৯৩৪ জন

২০১০ সালে ৫২ হাজার ১৩৪ জন

২০১১ সালে ৬২ হাজার ২৪৪ জন

২০১২ সালে ৮২হাজার ২১২ জন 

২০১৩ সালে ৯১ হাজার ১২২ জন

২০১৪ সালে ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন

২০১৫ সালে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০১ জন

২০১৬ সালে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬১ জন

২০১৭ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬১ জন

২০১৮ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন

উপরের তালিকা দেখে কি মনে হচ্ছে? নাসার তৈরি একটা রকেটের মতো লাগছে না? স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ড স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর অর্থাৎ ২০১৪ সালে বুঝতে পারে যে ঠিক আনুমানিক কত জনের মতো জিপিএ-৫ পাওয়া উচিত৷ পরিসংখ্যান বলছে যে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতিবছরই মোটামুটি এক লাখের উপরে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে৷

পৃথিবীর মানুষের কাছে অন্যতম একটা হাসির খোরাক হতে পারে বাংলাদেশের জিপিএ-৫-এর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান৷ মাত্র ৭৬ জন মেধাবী দিয়ে এই জিপিএ সিস্টেমের যাত্রা শুরু হয়ে আজ অবধি ১৭ বছরের ব্যবধানে বাড়ন্ত হতে হতে এ বছরে এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯-এ গিয়ে ঠেকেছে৷ 

জিপিএ-৫-এর পরিসংখ্যানের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা অথর্ব ও কূপমণ্ডূক হলে এমনটা হতে পারে! উপরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দেশে মেধাবীর সংখ্যা রকেটের গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হতে হতে ২০১৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক জিপিএ-৫-এর মধ্য দিয়ে মুক্তিবেগ কাটিয়ে মহাশূন্যে মোটামুটি একটা স্থবির অবস্থায় ভাসছে৷

২০০১ সালে জিপিএ-৫-প্রাপ্ত মেধাবী মাত্র ৭৬ জন, মাঝে ১৭টি বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন৷ যদি এই জিপিএকে মেধাবীর একটা ন্যূনতম মাপকাঠি ধরি, তবে ১৭ বছরে মেধাবী বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫৩ জন৷ কি অদ্ভুত, তাই না! 

ফলাফল বা ফলাফলের পদ্ধতি যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেন, ২০০১ সালের ৭৬ জনের একজন বলবে- আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি৷ ঠিক একইভাবে ২০১৮ সালে এক লাখ ১০ হাজার ৫৫৩ জনের একজন বলবে, আমিও জিপিএ-৫ পেয়েছি৷ একইভাবে ২০০১ সালে দেশে স্বনামধন্য কোনো স্কুলের ফার্স্ট বয় বলবে, আমার রেজাল্ট মাত্র জিপিএ- ৪.৬৩৷ যা কিনা এই আমলে ডাল-ভাত টাইপের রেজাল্ট৷ তখন ২০১৮ সালে কোনো স্কুলের নিয়মিত ফেলবয় ছাত্রটিও জিপিএ-৫ পেয়ে বলবে, ‘আই অ্যাম জিপিএ ৫’৷ ফার্স্ট বয় এবং ফেইল বয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকল না৷ মেধাবীর মূল্যায়ন তাহলে কীভাবে হবে? বর্তমান কালের মেধাবী ছাত্রটি পরিশ্রম করে পেল জিপিএ-৫ পক্ষান্তরে দুর্বল মেধার ছাত্রটিও পেল জিপিএ-৫৷ মেধার মূল্যায়ন রইল কোথায়?

পরিসংখ্যান দেখে অনুমান করা যাচ্ছে যে, ২০০০ সালে অর্থাৎ বোর্ড স্ট্যান্ডের যুগে দেশে তেমন কোনো মেধাবী ছিল না৷ আরও আগে প্রায় সবই ছিল মেধাহীন৷ অবাক লাগে যে রকেটের গতিতে মেধাবী চাষ করার দেশ হিসেবে কেন বাংলাদেশের নাম গিনেস বুকে যায় না!

বাংলাদেশে মেধাবীর বাম্পার ফলনের কারণ ও ফলাফল নিয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণা হতে পারে৷ উন্নত বিশ্বে সারা জীবন সাধনা করলেও কি এত এত মেধাবী চাষ করতে পারবে? পারবে না৷ তবে সোমালিয়া, উগান্ডার মতো অনুন্নত দেশ হয়তো পারলেও পারতে পারে৷ উদ্ভট শিক্ষাব্যবস্থা হলে সবই সম্ভব৷

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ  লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না- থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
শেখ হাসিনা: বাংলার মা
মৌলি আজাদ ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বিজনেস এথিকস বনাম ডাটা পাইরেসি
ইকবাল আহমদ ফখরুল হাসান ১৫ নভেম্বর ২০১৮
সেলিব্রেটি এবং রাজনীতির পাপেট শো
কাকন রেজা ১২ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
সাদা কাজলের ৫ ব্যবহার
সাদা কাজলের ৫ ব্যবহার
বাংলা ট্রিবিউন - ১ দিন, ১৪ ঘণ্টা আগে
এনামুল জুনিয়রের ৫ উইকেট
এনামুল জুনিয়রের ৫ উইকেট
বাংলা ট্রিবিউন - ১ week, ৩ দিন আগে
সংলাপের ফলাফলেও নজর ইসির
সংলাপের ফলাফলেও নজর ইসির
বিডি নিউজ ২৪ - ১ week, ৫ দিন আগে
হাটহাজারীতে ঘরে বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ
হাটহাজারীতে ঘরে বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ
বিডি নিউজ ২৪ - ২ সপ্তাহ, ২ দিন আগে