জামান সাহেবের স্ত্রী: পর্ব ৫

এই ভয়ঙ্কর চিন্তা-ভাবনার মানুষটি তার স্বামী, যে নারীকে কেবল একতাল মাংসপিণ্ড মনে করে।

রুমানা বৈশাখী
বিভাগীয় প্রধান (প্রিয় লাইফ)
১৬ মে ২০১৮, সময় - ২২:৫০

প্রচ্ছদ: সোহানুর রহমান অনন্ত, প্রকাশক: রাজিয়া রহমান জলি, জাগৃতি প্রকাশনী
কাহিনী সংক্ষেপ 

তার নিজের কোনো নাম ছিল না, ছিল কেবল একটি পরিচয়। তিনি জামান সাহেবের স্ত্রী। এই পরিচয়ে তার কোনো আপত্তিও ছিল না কোনোদিন।

তারপর একদিন গভীর রাতে জামান সাহেব ঘরে নিয়ে এলেন আরও একজন বউ...

ক্ষোভে কিংবা অভিমানে, 
ক্রোধে কিংবা অপমানে, 
একই ছাদের নিচে থেকেও প্রিয় পুরুষটির সাথে সেই নারী তৈরি করে নিলেন এক জীবনের ব্যবধান। একমাত্র পরিচয়খানাও তাই গেল হারিয়ে, সে রাতেই। শুনতে পাওয়া যায়, জীবনে আর কোনোদিন জামান সাহেব তাকে দেখতে পাননি। চোখের দেখাও না।

এই গল্প, তীব্র অভিমানে আজীবন অবগুণ্ঠনের আড়ালে থাকা একজন নারীর, প্রিয় মানুষটিকে যিনি দিয়েছিলেন খুব কঠিন শাস্তি।

এই গল্প সম্পর্কের জটিল সমীকরণে জড়িয়ে যাওয়া একজন পুরুষের, যিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন ভালোবাসার পাপ।

তারপর একদিন... 
বহু বছরের ব্যবধান পাড়ি দিয়ে জীবন তাদেরকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল আবারও মুখোমুখি।

এই গল্প অপমান, প্রতারণা, বঞ্চনার।
এই গল্প পাপ, স্মৃতি ও ভালোবাসার।
এই গল্প বহুকাল বাদে দুজন মানব-মানবীর প্রথম দেখার।
এই গল্প তীব্র অভিমানে জীবন পার করে দেওয়ার।

কিংবা- 
একজন তরুণী গৃহবধূর। 
তারও নিজের কোনো নাম ছিল না, কিংবা হারিয়ে গিয়েছিল সংসারের গর্ভে।

তিনি কিংবা তারা... জামান সাহেবের স্ত্রী।

(‘জামান সাহেবের স্ত্রী’একটি উপন্যাস। চলতি বছরের মে মাসেই প্রকাশিত হবে গ্রন্থ আকারে, প্রকাশ করবে জাগৃতি প্রকাশনী। প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে উপন্যাসটি। পাঠকের সাড়া পেয়ে নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব। - রুমানা বৈশাখী) 

৫. বিকেল হলে আলতা বানু জলচৌকি পেতে বারান্দায় বসেন আরাম করে। কোলে থাকে রুপোর পানের বাটা। যত্ন করে পান সাজেন একের পর এক। তার আবার পানের নেশা খুব, জর্দায় ভরা ঘোর লাগানো মিষ্টি মিষ্টি পান।

মাথায় সুগন্ধি তেল ঘষে যত্ন করে খোঁপা বেঁধে দেয় একজন, অন্যজন পায়ে পরিয়ে দেয় আলতা। নামখানি আলতা বানু বলেই হয়তো আলতা রাঙা হাত-পা বেগম সাহেবার ভারি পছন্দের। সোনার দুখানি নূপুর পরেন পায়ে, বারান্দাজুড়ে ঝুমঝুম আওয়াজ তুলে হাঁটেন। আলতা রাঙা পায়ে সদ্য পাট ভাঙা ঢাকাই শাড়িতে তাকে দেখায় ইন্দ্রাণীর মতন। শরীরে আজকাল একটু মেদ জমেছে বটে, তবে ফর্সা রঙের সাথে তা-ও মানিয়ে যায় বেশ। কাঁটা কাঁটা চেহারাখানির সাথে ভারী গড়ন বেশ একটা ঢলঢলে লাবণ্য নিয়ে আসে চোখে-মুখে। শেষ বিকেলের মায়া ভরা আলোতে তখন ভারি রূপসী দেখায় তাকে।

অবশ্য বেগম সাহেবা বাস্তবিকই রূপসী বটে। লোকে বলে এই রূপের আগুনেই নাকি জ্বলে গেছে আফরোজা বেগমের ঘর। সন্তান-টন্তান সব বাজে কথা। জামান সাহেব নাকি এই রূপে এমন মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, আলতা বানু ব্যতীত কাউকে দেখতেই পেতেন না চোখে। রূপসী নবনীও একটু-আধটু, তবে শাশুড়ি মায়ের ধারের কাছেও না। আলতা বানুর রূপে আগুন আছে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন, যে আগুনে পুরুষ হৃদয় জ্বলে-পুড়ে মরে অসহায়ের মতন।

‘এই মেয়ে, তোরে না বলসি ভালো শাড়ি-ব্লাউজ পরবি?এইসব কী। বড় ঘরের বৌ এইসব ত্যানা পরে?’
শাশুড়ির ধমকে হাসে একটু নবনী, পায়ে আরও যত্ন করে আলতা ঘষে দেয়। যদিও এইসব চুল বাঁধাবাঁধি, আলতা ঘষাঘষি তার ভালো লাগে না। বড্ড মেকি, বড্ড অহেতুক লাগে। কিন্তু বেগম সাহেবাকে সে কথা বোঝায় কে!

বেগম সাহেবার মতে, স্বামী ঘরে বেঁধে রাখার একমাত্র সূত্র হচ্ছে মেয়ে মানুষের রূপ। বউ গোছানো, সুন্দর, পরিপাটি হলে পুরুষ মানুষের মনও ঘরে টেকে। এতকাল সংসার করছেন জামান সাহেবের সাথে, আজতক ভদ্রলোক অন্য কোনো দিকে মন দিয়েছে?

দেয়নি... দেয়নি...দিতে পারেনি! আলতা বানু সুযোগ দিলে তবেই না অন্য দিকে মন দেবে!

‘আপনি তো সুন্দর, আম্মা। সাজলে পরীদের মতন লাগে। আমি সাজলে খারাপ দেখায়।’

প্রশংসায় একটু নরম হয় আলতা বানুর ঢলঢলে মুখটা। ‘আরে নারে বেটি, তুইও সুন্দর। সুন্দর না হইলে কি বউ কইরে আনতাম নাকি। শুন, সোয়ামি ঘরে থাকলে সাজগোজ করা লাগে। ভালো শাড়ি-গহনা হইতেসে মেয়ে মানুষের সৌন্দর্য। এইসবের কাজ আলমারিতে ফালায় রাখার না। এইগুলান পরবি, সুন্দর কইরে সাজবি। ঢং কইরে ব্লাউজ বানাইবি, স্নো-পাউডার দিবি। দেখবি, সকাল হইয়ে সন্ধ্যা হইব, সোয়ামি তা-ও ঘরের কপাট খুলতে দিব না দিনের পর দিন...’

নিজের অশ্লীল রসিকতায় নিজেই শরীর দুলিয়ে হাসে আলতা বানু। আর গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নবনী। তার স্বামী যেভাবে খুশি হবে, সেই সাজ বুঝি কোনোদিনও তার পক্ষে সেজে ওঠা সম্ভব হবে না। শহর থেকে এনে দিয়েছিল একটা পোশাক, প্রথম বিবাহবার্ষিকীর দিনে। হুকুম ছিল রাতের বেলা পরে বিছানায় যেতে হবে। পোশাক তো নয়, দুই টুকরো ন্যাকড়ার মতো কিছু একটা। নবনী লজ্জায় ভালো করে দেখতেও পারেনি, স্বামীর শত তিরস্কারেও পারেনি। আলমারির সবচাইতে নিভৃত কোণে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে একটা গোপন পাপের মত।
ছি ছি ছি, কী লজ্জা! কী লজ্জা!

এসব গায়ে চাপিয়ে অন্যের সামনে কীভাবে যাবে সে? কীভাবে করবে সেই অঙ্গভঙ্গি, যা স্বামী করতে বলেন?

মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা নবনী আজীবনের সংস্কার ছেড়ে স্বামীর আধুনিকতায় ঠিক মানিয়ে নিতে পারেনি। নিজের শরীরটা ঠিক পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেনি স্বামী পুরুষের সামনে। শরীরের ভালোবাসা দুটি মানুষের মাঝে হবে, দুটি আত্মার মাঝে হবে। কেন সেখানে একজন নিজেকে উপস্থাপন করবে মাংসপিণ্ড রূপে, আর অন্যজন পালন করবে শুধু ভক্ষকের ভূমিকা? কেবল দেহের আনন্দটাই সব, এখানে কি মনের কোনো ভূমিকাই নেই?

সেবারই প্রথম, সেবারই শেষ অবশ্য। আরিফুজ্জামান আর কখনো কিছু নিয়ে আসেনি শখ করে। ‘গেঁয়ো ভূত’ বলে গাল বকতে বকতে মোবাইল ফোনে ছবি বের করে দেখিয়েছে বরং। পরীর মতো সুন্দর সব মেয়েদের ছবি। কেউ দুই টুকরো কাপড় পরা, আবার কেউ বা নগ্ন আগাগোড়া। পুরুষদের সাথে সহবাস করছে ক্যামেরার সামনে। একজনের সাথে, দুইজনের সাথে। একই সাথে দুই/তিন/চারজনের সাথে। আরিফুজ্জামান বলেছে, এইসবকে ‘নীল ছবি’ বলে। ইংরেজিতে পর্ন। বিদেশি মেয়েরা এসব করে, শহরের মেয়েরাও এসব করে, নবনীর মতো গেঁয়ো ভূতকে দিয়ে যা কোনোদিন হবে না।

নবনীর কেন যেন মনে হয়, আরিফুজ্জামান লোকটা জীবনকে খুব চাঁচাছোলা দৃষ্টি দিয়ে দেখে। সে মনে করে জগতের সকল নারীই বুঝি এমন, সেই নীল ছবির স্বল্পবসনা মেয়েদের মতন। পৃথিবীর সব নারীই যখন-তখন যৌনতায় মত্ত হতে পারে, একসাথে তিন/চার পুরুষের সাথে সহবাস করতে কারো কোনো আপত্তি নেই। সে মনে করে নারীরা ইচ্ছে করেই ধর্ষিত হতে চায়, ধর্ষণে নারীর কোনো অসুবিধে হয় না। নারী নিজেকে সাজায় পুরুষের জন্য, পোশাক পরে পুরুষের জন্য এবং বিছানায় নিজের দেহখানা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন ব্যতীত সংসারে নারীর অন্য কোনো ভূমিকা নেই...

কথাগুলো ভাবতে গেলেই তীব্র একটা হাহাকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায় নবনীর হৃদয়। তীব্র আর অন্তহীন সেই হাহাকার, কখনো শেষ না হওয়া রাতের মতন।

এই মানুষটি তার জীবনসঙ্গী!

এই ভয়ঙ্কর চিন্তা ভাবনার মানুষটি তার স্বামী, যে নারীকে কেবল একতাল মাংসপিণ্ড মনে করে কিংবা মনে করে কোনো খাবার। এই মানুষটির সাথে তাকে সম্পূর্ণ জীবন কাটাতে হবে...সম্পূর্ণ জীবন কাটাতে হবে...

ভাবতে ভাবতে নবনীর মন গহীন অন্ধকারে ছেঁয়ে যায়, এক টুকরো আলোর জন্য আঁকুপাঁকু করতে থাকে বুকের গভীরে কিছু একটা। যে গভীরে থাকে ভালোবাসার স্বপ্ন, যে গভীরে থাকে একজন সঙ্গীর কল্পনা। কেবল পুরুষ নয়, কেবল স্বামী নয়। জীবনসঙ্গী, ভালোবাসার পুরুষ, যার বাহুডোরের সীমারেখায় নিশ্চিন্তে সাজিয়ে নেওয়া যাবে ছোট্ট একখানা লাল-নীল সংসার। প্রেমের ছায়াপথ বেয়ে আসবে দেবশিশুরা, ছোট ছোট পায়ে ছুঁটে বেড়াবে ভালোবাসার উর্বর জমিনে।

... আহ স্বপ্ন!... স্বপ্ন... স্বপ্ন... স্বপ্ন!

জীবন খুব বেশি দেখেনি নবনী, এটুকু বয়সে খুব বেশি দেখাও যায় না। শুধু দেখেছে, এই বাড়িতে ষোড়শীর স্বপ্ন ছত্রিশে গিয়েও স্বপ্নই থেকে যায়। ভালোবাসারা প্রায়ই সম্পর্কের চার দেয়ালের মাঝে প্রতারিত হয় ভীষণ। শরীরের কামনা আর অর্থের চটকদার যুগলবন্দীর সুরে হারিয়ে যায় শুদ্ধতা আর পবিত্রতা। পাশে বসে থাকা বাস্তব মানুষটির চাইতে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় মোবাইল ফোনের পর্দায় দেখা অবাস্তব মানুষগুলোকে।

নবনী তাই স্বপ্ন দেখে না। নবনী জানে, অধিকার ছাড়া স্বপ্ন দেখতে নেই।

কেননা...
ভাঙা স্বপ্নের কাচ যখন চোখে বেঁধে, তখন বাকি জীবন আর ঘুম নামে না চোখে!

(চলবে...)

আগের পর্বগুলো পড়তে চাইলে

জামান সাহেবের স্ত্রী পর্ব- ১

জামান সাহেবের স্ত্রী পর্ব-২ 

জামান সাহেবের স্ত্রী পর্ব-৩

জামান সাহেবের স্ত্রী পর্ব-৪ 

 

প্রিয় সাহিত্য/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট