মুহম্মদ জাফর ইকবাল সমাজের একজন সচেতন নাগরিক, বিশিষ্ট ও বিদগ্ধজন। দেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষক। দেশের যুব শ্রেণীসহ সবাই তার লেখা পড়ে, যা সবাইকে প্রভাবিত করে। তার সাদাসিধে লেখা, কথাবার্তা ও ক্ষুরধার সমালোচনা, বিশ্লেষণ আমি পড়ি। প্রভাবিত হই। জীবনে সৎ, ন্যায়পথে চলার উৎসাহ পাই, পেয়েছি। আমি সবসময় তার লেখা, তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও সমাজ বিশ্লেষণের বিষয়গুলো, বিশেষ করে শিক্ষা বিষয়ক গবেষণামূলক লেখার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করি। কিন্তু 'রাজনীতি নিয়ে আমার ভাবনা' শীর্ষক এই লেখা আমাকে পরিপূর্ণভাবে হতাশ করেছে, ব্যথিত করেছে। আমাকে সম্পৃক্ত করে তিনি লিখেছেন এ জন্য আমাকে ব্যথিত করেনি, আমাকে ব্যথিত করেছে এ জন্য যে, তার লেখাটি মনগড়া এবং তথ্য নির্ভর নয় বলে। সরকারি কাজ কীভাবে হয়, কীভাবে বাজেট বরাদ্দ হয়, বাজেট কীভাবে ব্যয় করা হয় ইত্যাদি তিনি ভালো জানেন। বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে সড়ক সংস্কার ও মেরামত কীভাবে হয়, তাও তিনি নিশ্চয় ভালো জানেন। গত বছর ঈদের সময় মানুষ যথারীতি বাড়িতে গিয়েছে এবং ফিরেও এসেছে। অতিবৃষ্টির কারণে সড়কে সাময়িক খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময়ে তা দ্রুত চলাচল উপযোগী করা হয়েছিল। এ কথা সত্যি, এটা বৃষ্টির আগেই করা যেত। এ ব্যাপারে আমি যথাসময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থ চেয়েছি। বিষয়টি ত্বরান্বিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তাৎক্ষণিক সারসংক্ষেপ প্রেরণ করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব উপলব্ধি করে বরাদ্দের জন্য অর্থ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ বরাদ্দ না করায় দ্রুত সড়ক মেরামতের কাজ করা সম্ভব হয়নি। সে সময়ে এ বিষয়টি দেশবাসী সবাই জানেন। এ নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানেন, বাজেটের এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া পদ্মা সেতু নিয়ে যা লিখেছেন তাও সত্যের অপলাপ। তথ্য না জেনে, কতিপয় পত্রিকার অসত্য রিপোর্ট বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের একটি মনগড়া এবং ব্যক্তি আক্রোশমূলক লেখা তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল না। সবার মনে আছে, মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের চলচ্চিত্রের নতুন ধারার পরিচালক তারেক মাসুদ ও প্রখ্যাত সাংবাদিক মিশুক মুনির মৃত্যুবরণ করেন। তাদের অকাল মৃত্যুতে দেশের চলচ্চিত্র ও সংবাদ জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, দুই গাড়ির চালকের অসতর্কতা ও অতিবৃষ্টির কারণে 'ভিজিবিলিটি' না থাকায় এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। ওই সড়কে কোনো খানাখন্দ কিংবা গর্ত ছিল না, কোনো সমস্যা ছিল না। অথচ এতে যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে আমাকে দায়ী করে পদত্যাগ চাওয়া হলো। দুর্ঘটনার দায় আমার ওপর চাপিয়ে মিডিয়ায় তুলকালাম বাধানো হলো। এখন প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটে। কই, তেমন উচ্চবাচ্য তো শোনা যায় না? অর্থাৎ কেন জানি আমাকে টার্গেট করে কেউ কিছু অর্জন করতে চায়। তবে আমি বিশ্বাস করি, দুর্ঘটনা রোধে আমাদের অনেক কাজ করার আছে, আমাদের এখনও অনেক দূর যেতে হবে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। বিশ্বব্যাংকের এই অভিযোগ মোটেই সত্য নয়। বিশ্বব্যাংকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের নামে-বেনামে চিঠি লেখা, স্বাক্ষর সুপার ইমপোজ করে চিঠি লেখা এবং কাল্পনিক ও অসত্য অভিযোগের ভিত্তিতে চিঠি লিখে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ সেতু দ্রুত নির্মাণে যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে আমি কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের অংশীদার। পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রথম থেকেই স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা শত ভাগ নিশ্চিত করে কাজ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ডকুমেন্টে তা প্রতিফলিত। এ ক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতি, অবৈধ পথ অবলম্বন করার সুযোগ ছিল না। প্রতিটি পদক্ষেপে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে অনুমোদনে বিশ্বব্যাংক কখনও দুর্নীতির অভিযোগ করেনি। মূল সেতুর কাজের উপদেষ্টা নিয়োগ এবং দরদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে শেষ দিকে হঠাৎ কাল্পনিক ও অসত্য দুর্নীতির কথা বলে বিশ্বব্যাংক। যেখানে বিশ্বব্যাংকের একটি টাকাও ছাড় হয়নি, সেখানে দুর্নীতি হয় কীভাবে? ইতিমধ্যে দুদক মূল ব্রিজের দরদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করেছে এবং দুদকের রিপোর্টে কোনো ধরনের দুর্নীতি প্রমাণিত হয়নি। মূলত একটি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী গ্রুপের অপপ্রচারে পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করা হয়েছে। সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড যা ১৯৭৫ সালে সৃষ্টি এবং জন্মলগ্ন থেকে সুনামের সঙ্গে কাজ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর কোনোভাবেই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজে সাকো অংশগ্রহণ করেনি। আমি মন্ত্রী হওয়ার আগেই সাকোর এমডির পদ থেকে পদত্যাগ করি। এগুলো অবহিত থাকা সত্ত্বেও বারবার নতুন করে পুরনো বিষয়াবলী পাঠকের কাছে নিয়ে আসা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? আমি সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করি। আমি সারা জীবন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে এসেছি। বিভিন্ন সময়ে সরকারি দায়িত্বও পালন করেছি। অনেকে অর্থ উপার্জন করে আরামে-আয়েশে দিন কাটায়, কলকারখানা বানায়, অনেকে টাকা আয়-বর্ধনশীল কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে। আমি সৎ উপায়ে অর্জিত আমার উপার্জনের টাকা দিয়ে আর্ত মানবতার সেবা করেছি, করে যাচ্ছি। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে আমার কষ্ট লব্ধ উপার্জিত অর্থ ব্যয় করেছি। আমি শিক্ষা প্রসারে আমার সাধ্যমতো কাজ করে চলেছি। আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন দেখতে আসে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকও এসেছিলেন আমার এলাকায়, আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। মাদারীপুর, কালকিনিতে আমার গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখার জন্য মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান শিক্ষার গুণগত মান, অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী (যারা অনেকেই তার সহকর্মী) ও শিক্ষার পরিবেশসহ যাবতীয় কার্যক্রম দেখলে তিনি বুঝতে পারবেন, আমি কীভাবে দেশে শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে কাজ করেছি। তিনি তার লেখায় আশাবাদী হয়ে লিখেছেন, 'আমাদের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে। লেখাপড়ার মধ্যে একটা বিপ্লব শুরু হতে যাচ্ছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ যা পারেনি আমরা সেটা পেরেছি। মেয়েদের ছেলেদের পাশাপাশি সমান জায়গায় নিয়েছি।' তার সেই আশাবাদী জায়গায় আমি ভিত রচনায় কাজ করেছি। আমি মনে করি, আমার প্রতিষ্ঠিত ৬টি কলেজ ও অসংখ্য বিদ্যালয় নিয়ে যদি তিনি একটি গবেষণা করেন, তাহলে দেখবেন শিক্ষা প্রসারে আমার অবদান কতটুকু। আমি প্রায় গত তিন বছর যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলাম। তিন বছর আমি প্রচুর কাজ করেছি। সরকারি প্রকল্পের জন্য প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য চ্যানেলাইজ করেছি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং বর্তমান রেল মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি। আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন সেতু বিভাগের বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। আমি দায়িত্বে এসে সেতু বিভাগের কার্যক্রমে গতি আনি। কার্যক্রম ত্বরান্বিত করি। মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আমি ব্যক্তিগত জীবনে একজন সৎ, নির্ভীক ও আদর্শবান লোক বলে জানি। আমি তাকে আদর্শবান ও সৎ এবং মিথ্যার প্রতি আরও সোচ্চার দেখতে চাই। কিন্তু কোনো কিছু লেখার আগে লেখকরা এতটুকু ভাবেন না এর প্রভাব এক ব্যক্তি বা তার পরিবারের ওপর কীভাবে পড়বে। এক ব্যক্তি কীভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়। আমি দেশের জন্য অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করি। সরকারি নিয়ম-কানুন কঠোর অনুসরণের মাধ্যমে কাজ করি। ব্যক্তি স্বার্থকে কখনও টেনে আনি না। জাফর ইকবাল তার লেখায় আমাকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন, আমি আদৌ সে ধরনের ব্যক্তি নই। লেখাটি সমকালে প্রকাশিত হয়েছে