পঞ্চগড়ে জমির মালিকদের কান্না

মানবজমিন প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

সরকারি নির্দেশনা থাকলেও পঞ্চগড় জেলার চারটি উপজেলায় বন বিভাগের দখলে থাকা ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি জমির রেকর্ড পাচ্ছে না বৈধ মালিকরা। বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ এসব জমি ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে সাধারণ ও নিরীহ জমির মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানিসহ সর্বস্বান্ত করছে। বিভিন্ন আদালতে শতাধিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারাধীন মামলায় কয়েক হাজার নিরীহ সাধারণ মানুষ আসামি। এসব মামলার খরচ চালাতে অনেকে নিঃস্ব কাহিল হয়ে পড়েছেন। মামলার জালে পড়ে বছরের পর বছর ধরে আর্থিক ক্ষতি ও হয়রানির জন্য ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার পাশাপাশি জমির মালিকানা নিয়ে সংশয়ের কারণে ওইসব লোকজন প্রধানমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী ও রেলপথ মন্ত্রীসহ জরিপ বিভাগের ঊর্র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন মন্ত্রণালয় ১৯৯৯ সালে জমির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ফরেষ্ট সেটেলমেন্ট আদালত স্থাপন করে। তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে ক্ষমতা দেয়া হয়। ২০০১ সালের ২৮শে মার্চ পঞ্চগড়ের ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার শুনানি শেষে এক রায়ে বলেন, জমিগুলো মালিকদের ফেরত দেয়া যেতে পারে। বন বিভাগ ইচ্ছা করলে অংশীদারের ভিত্তিতে চা চাষের পরিকল্পনা নিতে পারে। অথবা বন বিভাগ সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে জমির মালিকদের বিগত বছরগুলোর ক্ষতিপূরণসহ জমির মূল্য প্রদান করে বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু ১৯ বছরেও ওই রায় বাস্তবায়ন হয়নি। ৫৬ বছর ধরে ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি বন বিভাগ অবৈধ দখলে রেখেছে। জরিপ বিভাগ বনবিভাগের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসব ভূমি মালিকদের জমির বৈধতার রেকর্ড দিচ্ছে না। ১৯৬২ সালের পর এই এলাকায় আরএস জরিপ শুরু হয়েছে। সঠিকভাবে রেকর্ড করাতে না পারলে ভূমি মালিকদের যুগ যুগ ধরে দেওয়ানি আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে। এ নিয়ে এসব জমির মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। ২০১৭ সালের ৭ই মে জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিও প্রদান করে। জমির মালিকদের অভিযোগ মতে, বনবিভাগ প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ অনুযায়ী পঞ্চগড় জেলার ৫৬০২ দশমিক ৭৩ একর জমি ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৬৭ সালের মধ্যে গেজেটভুক্ত করে। কিন্তু জমির মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। বনবিভাগ শুধুমাত্র ১৯২৭ সালের সংরক্ষিত বনভূমির মালিকানা ও ওয়ার্কিং প্ল্যান অনুযায়ী সরকারিভাবে গাছ লাগানোর কথা। কিন্তু বনবিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে জমিগুলো কাগজে-কলমে দখলে রেখেছে। এসব জমির মধ্যে অনেকের বসতবাড়ি রয়েছে। কিছু জমি বনবিভাগের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীদের স্থানীয়ভাবে বর্গা দেয়া হয়েছে। প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ আওতায় গেজেটভুক্ত এসব জমির মালিকানা বন বিভাগকে দেয়া হয়নি। তবে অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ অনুযায়ী গেজেটভুক্ত জমি ভূমি মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান সাপেক্ষে যে কোনো সময় ফরেস্ট সেটেলমেন্ট অফিসার সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দিতে পারেন। অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ অনুযায়ী বনবিভাগ এসব জমি কোনোভাবেই দাবি করতে পারে না। কিন্তু এ জেলায় এ আইন অনুসরণ না করে নিরীহ ভূমি মালিকদের অযথা হয়রানি করা হচ্ছে। বর্তমানে পঞ্চগড় জেলায় আরএস রেকর্ড প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। অসহায় ভূমি মালিকরা রেকর্ড না পেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ধরণা দিচ্ছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রাইভেট ফরেস্ট অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ পর্যালোচনা করে গেজেটভুক্ত এসব জমি ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ২০১৭ সালের ২৭শে মার্চ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী গেজেটভুক্ত এসব জমি মালিকদের নামে রেকর্ড প্রস্তুত ও খতিয়ানের মন্তব্যে বন বিভাগের ব্যবহার্য লিখা যায় বলে নির্দেশনা দিয়েছেন। বন আইনের ৬ ধারায় ঘোষিত বনভূমি সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা সংক্রান্ত ২০১৮ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর মাসের সভায় সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব জমি বৈধ মালিকদের নামে রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য আদেশ প্রদান করেন।  ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার ২০১৬ সালের ৭ই ডিসেম্বরের এক পত্রে এসব জমির রেকর্ড সংশোধন করার যোগ্য বলে মত  দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ নির্দেশনা ও আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। দেবীগঞ্জ উপজেলার ভূমি মালিক ইসমাইল হোসেন, নুরুল আমিন, মো. খোরশেদ আলম, বোদা উপজেলার মো. ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, সরকার ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় প্রচলিত আইনে ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে এসব জমিতে সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা না করা পর্যন্ত কোনোভাবেই চলমান রেকর্ড ও খাজনা প্রদান বন্ধ রেখে ভূমি মালিকদের এভাবে হয়রানি করতে পারেনা। জরিপ অফিসে দিনের পর দিন ঘুরছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী ও রেলপথ মন্ত্রীসহ জরিপ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। দিনাজপুরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. শামছুল আজম বলেন, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব জমি বৈধ মালিকদের নামে রেকর্ড করা যায়। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তির কারণে তা হচ্ছে না।
সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন
আরও