শিক্ষা কর্মকর্তা যখন সাপ্লাইয়ার

মানবজমিন প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

বায়োমেট্রিক মেশিন, শিক্ষার্থীদের পোশাক এবং ১৭০ টাকা দামের শেখ রাসেলের জীবনীভিত্তিক বই ৫০০ টাকায় সাপ্লাই দিচ্ছেন উপজেলার সব স্কুলে। ইচ্ছেমতো মূল্যে তার থেকে এসব কিনতে বাধ্য করছেন স্কুলের শিক্ষকদের। এমন অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার ধুনট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ধুনট উপজেলা সভাপতি শফিকুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র ইতিমধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। ওই অভিযোগপত্রে শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ৫টি বিষয়ে দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, নীতিমালার কোন রকম তোয়াক্কা না করে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর শিশুদের জন্য পোশাক তিনি ঢাকা থেকে স্কুলগুলোতে সাপ্লাই দিয়েছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেই তিনি তার মনগড়া মূল্যে এসব পোশাক বিক্রি করেছেন স্কুলগুলোতে। এতে তিনি মোটা অংকের টাকা কৌশলে পকেটে ভরেছেন। সাম্প্রতি প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান কারো মতামত না নিয়েই গ্রামীণফোনের সাথে ব্যক্তিগত চুক্তি করে ওই মেশিনও অনেকটা জোর করেই সাপ্লাই দিচ্ছেন প্রতিটি স্কুলে। এতে শিক্ষকরা বাদী হলেও কোন শিক্ষকের কথা তিনি শোনেননি। উল্টো শিক্ষকদের বলেছেন, উপরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই মেশিন তিনি নিজ উদ্যোগে লাগাচ্ছেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করে বলেন, এই মেশিনের বাজার মূল্য কোয়ালিটি ভেদে ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। কিন্তু ওই কর্মকর্তা সেই মেশিন ১৬ হাজার টাকায় কিনতে বাধ্য করেছেন। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওই অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ধুনট উপজেলার মহিশুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী কিবরিয়াকে বছরের পর বছর ধরে মৌখিক ডেপুটেশনে উপজেলা শিক্ষা অফিসে রেখেছেন। বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্যের নাম ব্যববহার করে বিভিন্ন দুর্নীতি করেছেন। কাব স্কাউটিং এর টাকা শিক্ষার্থী অনুপাতে জমা না দিয়ে উপজেলা এবং জেলাতে মনগড়া ভাবে জমা দেন। অভিযোগপত্রতে এসব অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ধুনট উপজেলা সভাপতি শফিকুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান বলেন, ঘুষ, দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে ধুনট উপজেলা শিক্ষা অফিস। উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামরুলের ছত্রছায়ায় অনিয়মের রাজত্ব তৈরি হয়েছে। তারা আরো বলেন, ধুনট উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামরুল হাসান বাংলাদেশ উপজেলা শিক্ষা অফিসার কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি। একারণে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কোনো তোয়াক্কা করেন না। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উপজেলার ২০৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার জন্য সরকার প্রতিটি স্কুলে বরাদ্দ দেন। কিন্তু তিনি প্রতিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে তার অফিসে ডেকে নিয়ে বিল ভাউচারে আগেই স্বাক্ষর নেন তিনি। গ্রামীণ ফোন কোম্পানির সঙ্গে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ক্রয়ের চুক্তি করেন। তার চুক্তি মোতাবেক গ্রামীণ ফোন মেশিনগুলো সাপ্লাই দিচ্ছে। এতে ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা মূল্যের বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ১৬ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে স্কুলগুলোকে। এ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও ক্ষুব্ধ হলেও তাদের কিছু করার নেই। কারণ বিল ভাউচারের আগেই স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘শেখ রাসেল কুড়িতে ঝরে যাওয়া একটি ফুল’ নামের ১৭০ টাকা মূল্যের বইটি ৫০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করেন ২০৩টি স্কুলে। এই বই থেকে তিনি অর্ধলক্ষ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে এভাবে পণ্য সাপ্লাই দেয়ার সুযোগ শিক্ষা কর্তকর্তার আছে কিনা জানতে চাইলে ধুনট উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামরুল হাসান বলেন, বয়োমেট্রিক মেশিন শিক্ষকরা কিনতে পারবেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই মেশিনের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সব শিক্ষক জানে না। ফলে জেলা শিক্ষা অফিস উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সংসদ সদস্যসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বৈঠক বসে রেজুলেশনের করে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক মেশিন দেয়া হচ্ছে। পোশাক সাপ্লাই প্রসঙ্গেও তিনি একই কথা বলেছেন। তিনি নিজে করেননি রেজুলেশনের মাধ্যমে ক্রয় কমিটি করা হয়েছিলো। শেখ রাসেলের জীবনীভিত্তিক বই বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বইয়ের দাম ১৭০ টাকা হলেও বই এর সাথে পাঠপরিকল্পনার ফটোকপি, স্লিপ গাইডলাইনসহ ৫০০ টাকা নেয়া হয়েছে। একজন শিক্ষা কর্তকর্তা স্কুলে স্কুলে এভাবে পণ্য সাপ্লাই দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, এমন এখতিয়ার শিক্ষা কর্মকর্তার নেই। বায়োমেট্রিক মেশিন ক্রয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মেশিন ক্রয়ের দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের। মেশিন কেনার জন্য কোন মিটিং হয়নি, রেজুলেশন হয়নি। এমন কি কামরুল হাসানকে দায়িত্বও দেয়া হয়নি। তিনি যদি স্কুলগুলোতে জোর করে মেশিন দিয়ে থাকেন তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন
আরও