শোকের সঙ্গে কেমিক্যাল গুদাম সরানোর দাবি

মানবজমিন প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কালো পতাকা হাতে। বুকে কালোব্যাজ। ব্যানার নিয়ে চুড়িহাট্টা মোড়ে দাঁড়িয়েছেন শত শত মানুষ। তাদের দাবি একটাই আবাসিক এলাকা থেকে সকল বোমা সরানো হোক। কেমিক্যালরূপী বোমার মধ্যে আর বসবাস করতে চান না তারা। প্রতিবাদকারীরা সাধারণ মানুষ। তারা জানান, কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দেয়ার নেপথ্যে মুনাফা। অতি মুনাফার কারণেই কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দেন পুরান ঢাকার অধিবাসীরা। বারবার অভিযান হলেও শেষ পর্যন্ত গোডাউনগুলো বহাল-তবিয়তে থেকেই যায়। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ওই এলাকারা সাধারণ মানুষের। চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর এ বিষয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা। কিন্তু রহস্যময় ভূমিকা বাড়ির মালিকদের। যারা কেমিক্যালের গোডাউন ভাড়া দেন। তারা কেমিক্যালের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি না। গতকাল রাস্তায় প্রতিবাদ জানাতে গেলেও এসব বাড়ির মালিকরা ছিলেন অনুপস্থিত। অনেকের মতো কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর দাবি নিয়ে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন সন্তান হারানো পিতা মো. নাসির উদ্দিন।তিনি জানান, যেকোনো মূলেই যেন কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানো হয়। পুরান ঢাকাকের মৃত্যুপুরী উল্লেখ করে নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা বোমার মধ্যে বসবাস করছি। প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউন আছে। আমরা জানি যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। আমরা জেনেবুঝে ভাড়া দিচ্ছি। অতি মুনাফার জন্য কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেয়া হয় বলে জানান তিনি। একমাত্র পুত্র হারানোর শোকে পাগলপ্রায় এই পিতা জানান, রাসায়নিক বোমা তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বাসার পাশে রাজমহল রেস্টুরেন্ট গিয়েছিল ওয়াসি উদ্দিন মাহী। রেস্টুরেন্টের বারান্দায় যেতেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে যায় চুরিহাট্টি এলাকায়। মুহূর্তের মধ্যেই রাজমহল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ানো মাহী অগ্নিদগ্ধ হন। এসময় বাঁচার জন্য চিৎকার করছিলেন মাহী। দুর থেকে দাঁড়িয়ে তার চিৎকার শুনলেও রক্ষা করার সুযোগ ছিল না কারও। খবর পেয়ে পরদিন সকালে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে মাহীর লাশ সনাক্ত করেন পিতা নাসির উদ্দিন। নিহত মাহী শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে নন্দকুমার দত্ত রোডের ২১/২২ নম্বর বাসায় থাকতেন। মাহীর পিতা বলেন, একজন পিতার কাছে সবচেয়ে কষ্টের হচ্ছে সন্তানের লাশ বহন করা। ছেলেকে হারিয়েছি, আমি চাই না আর কোনো পিতা তার সন্তানকে হারাক। এজন্য কেমিক্যাল ব্যবসা আবাসিক এলাকা থেকে অপসারণ করতে হবে। প্রয়োজনে বাড়ির মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে গোডাউন বাদ দিয়ে ফ্ল্যাট নির্মাণের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তিনি।চুড়িহাট্টায় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকিলের সঙ্গে। তিনি জানান, ৯০০ বর্গ ফিটের একটি বাসা ভাড়া দিলে সাত থেকে আট হাজার টাকা পাওয়া যায়। একই বাসা কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা অগ্রিম দেন এই ব্যবসায়ীরা। যে কারণে ফ্যামেলির কাছে ভাড়া না দিয়ে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে দিতে মালিকরা আগ্রহী। শাকিল বলেন, ছোট ছোট বাড়ি। প্রায় বাড়িই এক কাঠা-দেড় কাঠা জমির ওপরে। এসব বাড়িতে দুই তলা বিল্ডিং নির্মাণ করে একতলা ভাড়া দেয়া হয় কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছে আর দুই তলায় পরিবারসহ থাকেন মালিক।চুড়িহাট্টার বাসিন্দারা জানান, ২০১০ সালের ৩রা জুন নিমতলী ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারান ১২৪ জন। তখন দাবি ওঠে, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা থেকে প্রাণঘাতী কেমিক্যাল কারখানা আর গুদাম সরিয়ে নিতে হবে। তারপরও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বাড়িয়েই চলেছেন। স্থানীয় প্রভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। মাঝে-মধ্যে অভিযান হলেও থেমে নেই আবাসিক এলাকার কেমিক্যাল ব্যবসা। পুরান ঢাকার লালবাগ, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীর চর, শ্যামপুর, কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে, ব্যাটারি, পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, ঝালাই, খেলনা, জুতা-স্যান্ডেল, পারফিউম, বডি স্প্রে ইত্যাদি। গোডাউনগুলোতে মজুদ রাখা হয়, গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইলসহ ভয়ঙ্কর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। আগুনের ছোঁয়া পেলে তা বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে।এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা বোমার মধ্যে বসবাস করেন। সেখানে ঘরে ঘরে ভয়ঙ্কর বোমা। বিভিন্ন হিসেবে পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। ১০-১২ বছর আগে দুই-তিন হাজার গোডাউন ছিল। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গোডাউন নেই। ঢাকায় আছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যত দ্রুত সম্ভব আবাসিক এলাকা থেকে এসব কেমিক্যাল সরানো প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন