ছবি সংগৃহীত

অস্তিত্ব সংকটে বিএনপি

<strong>এম আবদুল হাফিজ:</strong> অষ্টম সংসদের সমগ্র সময়জুড়ে আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড আন্দোলন যা তীব্রতর হতে হতে 'লগি-বৈঠার' আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল- তার মুখে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও বিএনপি এমন সংকটে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের 'আন্দোলনের ফসল' ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের অপ্রথাগত ও অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপিকে চূড়ান্ত সংকটের আবর্তে ফেলেই বিদায় নিয়েছিল।

এম আবদুল হাফিজ
লেখক
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৫, ০৬:৩৩ আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১২:০০
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৫, ০৬:৩৩ আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১২:০০


ছবি সংগৃহীত
অষ্টম সংসদের সমগ্র সময়জুড়ে আওয়ামী লীগের প্রচণ্ড আন্দোলন যা তীব্রতর হতে হতে 'লগি-বৈঠার' আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল- তার মুখে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও বিএনপি এমন সংকটে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের 'আন্দোলনের ফসল' ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের অপ্রথাগত ও অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপিকে চূড়ান্ত সংকটের আবর্তে ফেলেই বিদায় নিয়েছিল। অতঃপর সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে সংগঠনটি একাধিকবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও ক্ষমতাসীনদের নির্���াতন-নিপীড়নের আঘাতে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিএনপি অতীতে বুঝেনি এবং বুঝতে অক্ষম যে নির্যাতন, নিপীড়ন ও আন্দোলন অভ্যুত্থান একই সূত্রে গ্রন্থিত এবং তা সব সময়ই সামষ্টিক রাজনৈতিক খেলারই অংশ। আওয়ামী লীগ এই সত্যটিকে বোঝে এবং তা মেনেও নেয়! সে জন্যই তারা রাজপথে দুর্বার এবং রাজনীতির কূটকৌশলেও পারঙ্গম। ফলে অত 'গ্রহণযোগ্যতা' খুব একটা না থাকলেও ক্ষমতা তাদের পদচুম্বন করে। পক্ষান্তরে বিএনপি এখনো বিষয়টিকে ন্যায়-অন্যায়ের ছকে ফেলে সূক্ষ্ম আইনি বিচারে দেখতে প্রয়াস পাচ্ছে। সেই ফাঁকে আওয়ামী লীগ 'লোকে কি মনে করবে' বা বিদেশে বন্ধু-সহযোগীরাই বা একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ক্ষমতা দখলকে কিভাবে নেবে- এসব বিবেচনায় নিজেদের না জড়িয়ে 'ক্ষমতা দখলকেই' অগ্রাধিকার দেয় আওয়ামী নেতৃত্ব। কারণ তারা জানে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পড়লেও 'নিছক ক্ষমতা'ই অনেক কিছুর সমাধান বলে দেয়। এরই মধ্যে চলমান সময়ের ধারায়ও কৃত অসাধুতা বা অনৈতিকতাও 'ফেইট একমপ্লি'তে পরিণত হয়। সময়ের 'খরস্রোতে' ভাসমান বহির্বিশ্ব এবং দেশের জনগণও তখন আর 'কী চাইলাম এবং কী পেলাম' তার হিসাব মেলাতে প্রস্তুত থাকে না। কিন্তু বিএনপি এখনো সেই হিসাবের খতিয়ান ও দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে রাজনৈতিক খেলার মাঠে আন্দোলনের নামে আসর জমাতে প্রচেষ্টারত। অথচ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাকরণও তাদের জানা নেই। শেখ সাহেব তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে প্রায়ই বলতেন, 'চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী'। বিএনপি বুঝতে অক্ষম যে কাদেরকে দলটি কিসের কথা শোনাচ্ছে। বিএনপির হালের যুক্তিতর্ক কবেই তামাদি হয়ে গেছে। তাদের আন্দোলনের ডাক-হাঁকও এখন ফাঁকা বুলি। কোনো অর্থবহ আন্দোলনের ন্যূনতম প্রস্তুতিও যে দলটির নেই- তা বললে কি সেটা অত্যুক্তি হবে। আন্দোলন-অভ্যুত্থানের একটি মেজাজ থাকে, লগ্ন বা প্রহর থাকে। আরো থাকে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত কিছু কিছু প্রতীকী ভাষা বা চিহ্ন। বিএনপির নেতারা তিন প্রস্থের স্যুট পরিধান করে রাজপথে নামেন। অথচ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো এরিসটোক্র্যাটকে গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি-পাজামা পরে ধাক্কা দিয়ে স্টার্ট হওয়া জিপে চড়ে দিনে আধাডজনের মতো জনসভা করতে দেখেছি। আসন্ন ম্যাট্রিক অথবা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থীদের ধমকিয়ে ছাত্র/যুবনেতা এম এ ওয়াদুদকে বলতে শুনেছি যে 'নাউ অর নেভার'। ভাইসব পরীক্ষায় বসবার সময় আগামীতেও আসবে; কিন্তু জালিম মুসলিম লীগ সরকারকে হটাবার এই-ই সময়। বিএনপির কি আন্দোলনের সেই মেজাজ আছে? সেই সময় বা লগ্ন জ্ঞান আছে? কি পাব বা কি হারাব তা হিসাব করে কি আন্দোলন হয়? হয় না। তাই বিএনপি এখনো পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব মেলাতে মশগুল। এবং আন্দোলনবিমুখ। কূটকৌশলেও দলটি নিজেদের ভোঁতা প্রমাণ করেছে। দলটি হয়তো ভাবছে যেকোনো একটি বিশেষ মহল কোনো বিশেষ কারণে বা বিরাজমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এক নাজুক সন্ধিক্ষণে সরাসরি ক্ষমতার দুর্গে প্রবেশ করাবে। তাদের মানসপটে থেকেও থাকতে পারে প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভাগ্যবিপর্যয়ের কথা এবং তা থেকে একটি সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে পুনরায় তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। তেমন অলৌকিকতা কখনো কখনো ঘটে বৈকি! কিন্তু এরই মধ্যে পদ্মা-যমুনায় পানি অনেকটা গড়িয়েছে। ঘোলা ও কুটিল হয়েছে তাদের স্রোতোধারা। এই ধারণার অতীত ক্রূর গাঙেয় বদ্বীপে উৎপত্তি হয়েছে নতুন বাস্তবতার। যে পথেই হোক- আন্দোলন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়- বিএনপিকে এই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আওয়ামী লীগ গত বছরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে যেভাবেই ক্ষমতায় এসে থাকুক না কেন- আওয়ামীরা পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে যেভাবে অপাঙ্ক্তেয় ছিল তার ধারণকৃত ক্ষমতার বদৌলতে এখন তারা আর সে অবস্থায় নেই। এখনকার পটভূমিকায় সাধারণ জনগণের জন্য কোনো সত্যিকারের সদিচ্ছা না থাকলেও নিছক টিকে থাকার খাতিরে তারা উন্নয়নের কিছু ভেল্কিবাজি প্রদর্শনে সমর্থ হয়েছে, যদিও সেগুলোর স্থায়িত্ব নেই। তাতেই তাদের জনগণের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে থাকবে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন তো তাদের জন্য মজুদ রয়েছেই। তবে ভিন্নমতের মানুষও এ দেশে নগণ্য নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে আওয়ামীরা গোয়েবলসীয় কায়দায় তাদের ইতিবাচক দিকগুলোকে ঘষেমেজে জনসমক্ষে খানিকটা উজ্জ্বল করতে পেরেছে। এর বিপরীতে বিএনপির নিস্পৃহ আন্দোলন আন্দোলন খেলা কতটা ধারে কাটবে তা রাজনীতির পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকরা যাচাই করবেন। প্রবাসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেটুকু সংবাদ পাই তাতে বিএনপি এখনো আন্দোলনে নিষ্প্রভ, ম্লান। সরকার তা আমলেই নেয় না। জনগণের কাছেও তা নেহাতই হাস্যরসের খোরাক। মনে হয় যে বিএনপির আন্দোলনের নামে শুধু রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকারই একটুখানি প্রচেষ্টা। এ দেশে এর আগে বিএনপি কখনো এতটা সাইডলাইনে চলে যায়নি। বিএনপির নিকট অতীতের নেতিবাচক রেকর্ডগুলোও সংগঠনটিকে কম ভোগায় না এবং তাও বিএনপিকে সার্বক্ষণিক ইমেজ সংকটে রাখে। তবু দেশের সামগ্রিক সংকটে বিএনপির একটি ভূমিকা শুধু কাম্যই নয়, অত্যাবশ্যকীয়। আমাদের সমস্যা যে বিএনপির মতো অতীতের এক ব্যর্থ রাজনৈতিক দলকে দিয়েই আমাদের বর্তমান সংকট অর্থাৎ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত বাকশাল না হলেও তারই আরেক নতুন সংস্করণের দিকে ধাবমান আওয়ামী সিন্দাবাদকে জাতির স্কন্ধ থেকে নামাতে হয়। বিএনপি সেটা না করতে পারলে বিএনপির হয়তো দলগত কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু জাতির জন্য তা হবে চরম দুঃসংবাদ। আজ গণতন্ত্রের চরম বিপদে জাতিকে এগিয়ে আসতে হবে। এ পর্যন্ত 'নির্বাচিত' গণতান্ত্রিক সরকারের হাতেই গণতন্ত্র সর্বাধিক মার খেয়েছে। প্রয়োজনে এবার জনগণকে গণতন্ত্রকে বাঁচানোর দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিতে হবে। একটিই শুধু আশা যে আমাদের জনগণ ঐতিহাসিক দায়িত্বগুলো পালনে কুণ্ঠিত হয়নি। লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস লেখাটি দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রথম প্রকাশিত [দায়মুক্তি: এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত শুধুই লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। এই বিভাগে প্রকাশিত কোনো লেখা বা লেখাংশের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে]