ছবি সংগৃহীত

আসুন, তামিমকে গালি দেই

গালি দিলেই শান্তি। অফিসে, বাসায়, সমাজে, রাস্তায়; অনেক অনেক কিছু না করতে পারার একমাত্র সমাধাণ কাউকে না কাউকে গালি দেওয়া। অতএব গালি দিন।

debbrata
লেখক
প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০১৫, ০৭:০৩ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৩:০০
প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০১৫, ০৭:০৩ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৩:০০


ছবি সংগৃহীত
তামিমকে আমরা গালি দেই। এই `আমরা‘ মানে, আক্ষরিক অর্থেই আমরা। বাংলাদেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বোদ্ধা-নির্বোধ, পন্ডিত-মূর্খ; তামিমকে গালি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সবাই একমত থাকি। কিন্তু গালিটা দেওয়ার আগে-পরে কখনোই ভেবে বের করা যায় না, গালির উপযুক্ত ঠিক কী অন্যায় সে করেছে। তামিম বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিয়মিত রান করে। তামিম বাংলাদেশকে অন্য অনেকের চেয়ে বেশী ম্যাচ জিতিয়েছে। তামিমের মেজাজটা একটু চড়া হলেও কখনোই তার বিপক্ষে কোনো স্ক্যান্ডাল ছিলো না। তারপরও আমরা তামিমকে গালি দেই। নানাবিধ যুক্তি দাড় করিয়ে গালি দেই। কেন? তামিম একেবারে টাটকা একটা সেঞ্চুরি করে ফেলেছে বলে প্রশ্নটা আলোচনায় তোলার ভালো একটা সুযোগ পাওয়া গেল। আমাদের ক্রিকেট বা জাতীয় কোনো বিষয়ে যৌক্তিক আলোচনা করতে গেলে গালিগালাজ হজমের ভয় থাকে; তামিমকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভয়টা আরও বেশী থাকে। আপাতত তামিম যেহেতু একটা বড় সেঞ্চুরি করেছেন, গনিত বিজ্ঞান বলে অন্তত ৪৮ ঘন্টা মানুষ গালি দেবে না। এই সুযোগে তামিমকে গালি দেওয়ার যুক্তি-কুযুক্তিগুলো একটু ভেবে দেখা যাক- কেন মানুষ তামিমকে গালি দেয়। এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে গতকাল প্রেসবক্সে বর্তমান সময়েরে অন্যতম মেধাবী তরুন সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনির সঙ্গে আলাপ করছিলাম। সে রীতিমতো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝালো যে, তামিমকে নিয়ে যেসব জনশ্রুতি ও অভিযোগ আছে, তা আসলে কেবলই ভয়াবহরকমের এক ভ্রান্তি ও স্মৃতিভ্রষ্টতার ফল। এইসব পরিসংখ্যান নিয়ে সে একটা লেখাও লিখে ফেলেছে। একই বিষয়ে বাড়তি কষ্ট করার মানে হয় না। আসুন বরং মূল প্রশ্নে যাওয়ার আগে তামিম সংক্রান্ত অভিযোগ ও তার ভ্রান্তিটা আরিফুল ইসলাম রনির লেখা থেকে দেখে নেই:
বলতে পারেন, তামিমের জন্য এই রান খুব বেমানান। সেটাও ঠিক। কিন্তু আমাদের কোন ব্যাটসম্যান কবে সুপার ধারাবাহিক ছিল? যেখানে একজন তামিম–সাকিব–মুশফিক গড়ে উঠতে সময় লাগে, ভুরি ভুরি নেই, সেখানে এই ধরনের প্রতিভাদের একটু আলাদা ট্রিটমেন্ট করতেই হয়। এই যে মুশফিক এখন আমাদের সেরা এবং সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান। অথচ একটা সময় টানা ৩৯ ওয়ানডে ইনিংসে কোনও ফিফটি করতে পারেননি মুশি। এর মধ্যে ৫ ইনিংসে ৪ বার শূন্য রানেও আউট হয়েছেন। তামিমের সেখানে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময় ২০০৯ সালে টানা ১৪ ওয়ানডে ইনিংসে ফিফটি না পাওয়া। ওই খরা তামিম কাটিয়েছিলেন জিম্বাবুয়েতে ৬৩, ৭৯ ও ১৫৪ রানের ইনিংস খেলে। আরও টাটকা উদাহরণ আছে। দেড় বছর ধরে রান ছিল না মাহামুদউল্লাহর ব্যাটে। ওয়ানডেতে ফিফটি ছিল না টানা ১৫ ইনিংস। এখন? মুশির ওই বাজে সময়ে যদি তাকে ছুড়ে ফেলা হত, আজকের মুশি কোত্থেকে আসত? ২০০৯, ২০১০ সালের তামিম, লর্ডস–ওল্ড ট্রাফোর্ডের সেঞ্চুরি, উইজডেন বর্ষসেরার প্রসঙ্গ তুললেই আজকাল অনেকের ভ্রূ কুঁচকে যায়। প্রশ্ন করে, ‘ওইটা বেচে আর কত খাবে? তামিমকে ওসব বেচে খেতে হয় না। বাংলাদেশের সব ব্যাটসম্যানের ক্যারিয়ার ঘাঁটুন, তামিমের উত্তরও পেয়ে যাবেন। আজকের (শুক্রবার) সেঞ্চুরির পর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রান তামিমের (৪২৫৭)। ৪২০৪ রান নিয়ে দুইয়ে সাকিব আল হাসান। সাকিবের (১৪২) চেয়ে কিন্তু তামিম (১৪১) ইনিংস খেলেছেন একটি কম! সাকিব মিডল অর্ডারে খেলেন। ২১ বার অপরাজিত থাকতে পেরেছেন বলে গড় ৩৫ ছুঁই ছুঁই। তামিম ওপেনার। মাত্র ১ বার অপরাজিত বলে গড় ৩০.৪০। তামিমকে নিয়ে সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ধারাবাহিকতা। অথচ এটাও ভীষণ ভোঁতা। ধারাবাহিক ব্যাটিংয়ের নিয়ামক যদি ধরি ফিফটিকে, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসেই তো তামিমের চেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান মাত্র ১ জন! ১৪২ ইনিংসে ৩৪ বার পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন সাকিব। গড়ে ৪.১৭ ইনিংসে ১ বার। তামিম সেখানে ৩৩ বার পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন ১৪১ ইনিংসে। গড়ে ৪.২৭ ইনিংসে ১ বার! এই দুজনের ধারেকাছে আছেন কেবল শাহরিয়ার নাফীস (৪.৪১ ইনিংসে ১ বার) ও এনামুল বিজয় (৪.৫০ ইনিংসে ১ বার)।
এবার তাহরে আমরা মূল প্রশ্নটা একটু ভাবতে বসি-এরপরও কেন তামিমকে লোকে গালি দেয়। ডাক বয়, ভাতিজা, ডানো বয়; হেন কোনো কুৎসিত ও অবমাননাকর উপাধি নেই যা তামিমকে দেওয়া হয়নি। তামিমের পরিবার ধরেও যাচ্ছে-তাই ধরণের গালিগালাজ করা হয়েছে এবং হয়। সেটা শুধু রাস্তার চায়ের দোকানী করলে কথা ছিলো না, তথাকথিত অনেক বোধবুদ্ধিওয়ালা লোকেরাও করে। কেন করে? রনি বলেছে, সামাজিক গবেষনা করা দরকার। আমি গবেষনা ছাড়াই দুটো উত্তর আছে বলে মনে করি; ১. পরশ্রীকাতরতা এবং ২. গল্পের সঙ্গে না মেলা। পরশ্রীকাতরতার যে সমস্যা, এটার স্বীকার বাংলাদেশের কমবেশী সব সফল মানুষই। বাঙ্গালী বিল গেটস বা মার্ক জাকারবার্গের গল্প সহ্য করতে পারে; বাড়ির কাছের পরিচিত কারো সাফল্য সহ্য করতে পারে না। বাঙ্গালী মদের আড্ডায় বসে কোনো এক সফল মানুষের মাতলামির অভিযোগ করে। বাঙ্গালী নিজে রাস্তায় ইভটিজিং করে বাসায় ফিরে অভিযোগ করে অমুক ক্রিকেটারটা মেয়েদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। এখানে সমস্যা ওই ক্রিকেটারের বাঁকা চোখ নয়; সমস্যা ওই ক্রিকেটারের সাফল্য। যেহেতু তামিম বাংলাদেশেরই একজন মানুষ এবং কারো কারো চেনাজানা মানুষই; সেই মানুষটি এমন করে ‘রাতারাতি’ ধনদৌলতের মালিক হয়ে গেল, এটা কারো সহ্য হয় না। এখন শুধু এই তত্ত্ব দিয়ে তামিম-বিদ্বেষটা বোঝা সম্ভব না। কারণ, এই তত্ত্ব সত্যি হলে মাশরাফি, মুশফিক থেকে শুরু করে বাকী সব সফল ক্রিকেটাররাও তো তামিমের মতো গালিগালাজ সহ্য করতো। ব্যর্থতার সময় কমবেশী সবাইকেই গালি দেওয়া হয়; তবে তামিমের মতো এতো বেশী কাউকে দেওয়া হয় না; সাকিব ছাড়া; সাকিবের ক্ষেত্রে সুযোগ কম পাওয়া যায় অবশ্য। সে ক্ষেত্রে শুধু পরশ্রীকাতরতা কারণ হতে পারে না। এখানেই দ্বিতীয় কারণটা দরকার: তামিম গল্পের মতো নয়। আসলে এই সর্বনাশটা আমাদের করেছেন পেলে ও ম্যারাডোনা। ছোটবেলা থেকে আমরা বইয়ে পড়েছি খেলোয়াড়রা ঝুপড়ি ঘর থেকে উঠে আসে। তাদের জীবনে দারুন একটা লড়াইয়ের ইতিহাস থাকে। মানে আপনার জীবনে অবশ্যই মোহাম্মদ রফিকের দারিদ্র অথবা মাশরাফি বিন মুর্তজার চোট; এরকম কোনো গল্প থাকতে হবে। নইলে আপনি প্রিয় হতে পারবেন না। এখন সমস্যা হল, তামিম যে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে, চট্টগ্রাম শহরের এতো ধনী পরিবারে জন্মেছে; এটাই আমরা মেনে নিতে পারি না। তুই ব্যাটা বড় লোকের ছেলে হয়ে ‘নায়ক’ হতে এসেছিস কেন! তামিমের চাচা বাংলাদেশের কিংবদন্তী ক্রিকেটার-অধিনায়ক, তামিমের বাবা বাংলাদেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় সংগঠক ও ক্রীড়াবিদদের একজন, তামিমের বড় ভাই টেস্ট সেঞ্চুরিয়ার; এই দোষ কী তামিমের? নাকি এমন পরিবারে জন্মালে খেলাধুলায় আসার নিয়ম নেই! তামিম আকরাম খানের ভাতিজা কেন, এ নিয়েই আামাদের কতোশত অভিযোগ। তামিমকে শুধু ভালো খেললে চলবে না; তার চাচার পরিচয় মুছে ফেলতে হবে। কী দারুন আবদার! আমি আশা করি না, এইসব লেখা পড়ে কারো আক্কেল দাত গজিয়ে যাবে। যারা গালি দেয়, তারা পড়ে না। তারা পড়বে বলে শুরু করে; তারপর ঠিক করে গালি দিতে হবে। গালি দিলেই শান্তি। অফিসে, বাসায়, সমাজে, রাস্তায়; অনেক অনেক কিছু না করতে পারার একমাত্র সমাধাণ কাউকে না কাউকে গালি দেওয়া। অতএব গালি দিন। অতএব আরেকবার গালি দিন তামিমকে। যুক্তি পাচ্ছেন না? আমি বলি। তামিম কাল এতোগুলো ওভার ধরে ব্যাটিং করলো কেন, এই যুক্তিতে হলেও গালি দিন। গালিতেই মুক্তি।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...