ছবি সংগৃহীত

কুক্ষিগত করতে নয়, ব্যবসা করতে এসেছি : আব্দুল আজিজ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরে যাচ্ছে তাঁর হাত ধরেই। এই অগ্রপথিক সম্প্রতি আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন প্রিয়.কম অফিসে। কথা বললেন জাজ মাল্টিমিডিয়া, সিনেমা এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে।সেসব শুনলেন সুদীপ্ত সাইদ খান।

Sudipto
লেখক
প্রকাশিত: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৭:৫৮ আপডেট: ১৭ জুন ২০১৮, ১৭:২৭
প্রকাশিত: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৭:৫৮ আপডেট: ১৭ জুন ২০১৮, ১৭:২৭


ছবি সংগৃহীত

ছবি: নাঈম প্রিন্স।

(প্রিয়.কম) আব্দুল আজিজ। জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার। ২০১২ সালে গড়ে তোলেন জাজ মাল্টিমিডিয়া। ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবি প্রযোজনার মধ্য দিয়ে ছবি প্রযোজনায় নাম লেখান। শুধু তাই নয়, এক সঙ্গে ৫০টি সিনেমা হল ডিজিটালও করেন। ক্রমান্বয়ে দেড় শতাধিক সিনেমা হল ডিজটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসেন। বলা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরে যাচ্ছে তাঁর হাত ধরেই। এই অগ্রপথিক সম্প্রতি আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন প্রিয়.কম অফিসে। অংশ নিলেন আড্ডাতেও। কথা বললেন জাজ মাল্টিমিডিয়া, সিনেমা এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে।সেসব শুনলেন সুদীপ্ত সাইদ খান।

প্রিয়.কম: ব্যবসায়ী থেকে প্রযোজক?

আব্দুল আজিজ: স্রেফ ব্যবসা করার জন্যই আসা। এটা আমার একটা নতুন ব্যবসা। কিছুদিন পর পর আমি নতুন কিছু ব্যবসা ধরি। তারপর সেটা নিয়ে মুভ করি। আমি মনে করি, চলচ্চিত্রের মাঠটা ফাঁকা আছে। রুগ্ন ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকলে সেটাকে সবল করতে পারলে লাভবান হওয়া যায়, আবার ঝুঁকিও হতে পারে।সেজন্য প্ল্যান মাফিক এগুতে হয়।

প্রিয়.কম: ছোটবেলায় সিনেমা নিয়ে এমন কোনো স্বপ্ন ছিল কিনা?

আব্দুল আজিজ: সিনেমা বা প্রযোজক হওয়ার কোনো স্বপ্ন ছিলো না। ইচ্ছে ছিল পাইলট হওয়ার, ইচ্ছে ছিল আকাশে উড়ে বেড়াবার। দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর। যেহেতু আমার চশমা নেই। তাই পাইলট হওয়া হয় নি। পরে পৈতৃক ব্যবসাতেই ইনভলব হয়ে গেছি।

প্রিয়.কম: জাজ চালু করলেন, যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করছেন, নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।কিন্তু সেইরূপ সফলতা আমরা কিন্তু দেখছি না-

আব্দুল আজিজ: আমি যতখানি টেনে নিই। আবার পিছিয়ে যায়। এখন খুবই বাজে অবস্থা।জাজ বাদে অন্য যারা ছবি রিলিজ দিচ্ছে তারা যদি ছবি রিলিজ না দেয় তাহলে ভাল হয়। যারা ছবি নির্মাণ করছেন তারা যদি ছবি নির্মাণ বাদ দেয় তাহলে আমার ছবি ভাল যাবে।

প্রিয়.কম: কারণ কি? তাদের ছবি নির্মাণ বাদ দিতে হবে কেন?

আব্দুল আজিজ : কারণ হচ্ছে, একটি ছবি মুক্তি দিতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। রিলিজ করার পর এই রিলিজের খরচটাও উঠে আসে না। সেক্ষেত্রে রিলিজ না দিলে বরং তার সম্পদটা ঘরে থাকবে।

প্রিয়.কম: এই লসের কারণ কি?

আব্দুল আজিজ: লসের কারণ হচ্ছে, মার্কেটিং স্টাডি নেই। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া থেকে কিছু লোকজন আসছে যারা সিনেমা বুঝে না। তারা লম্বা টেলিফিল্ম টাইপের ছবি বানিয়ে দর্শক ফিরিয়ে দিয়েছে।আমরা ভালোবাসার রং রিলিজ করে কিছু দর্শক পেয়েছিলাম কিন্তু তারা ছবি বানাতে এসে তাদের আরও তাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রিয়.কম: এটা কি শুধুই অদক্ষ পরিচালকদের দোষ নাকি এর সঙ্গে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিরও কিছু দোষ সংযুক্ত?

আজিজ: এইখানে প্রধান দোষ বলবো প্রযোজকদের। কারণ তাদের কোনো মার্কেটিং পলিসি নেই। মাঠ স্টাডি নেই। বর্তমানে প্রফেশনাল কোনো প্রযোজক নেই।যারা আসে তাদের বেশিরভাগই একটা স্বপ্নের জগতে বাস করে। তাদের বোকা বানিয়ে আনা হয়। প্রফেশনালি কোন মানুষ আসছে না।

বর্তমানে এখানে তিন ধরনের মানুষ আছে। কিছু লোক আসছে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের মোহ থেকে । আরেকটা গ্রুপ আসতেছে বোকা হয়ে। যেমন, একজন পরিচালক গিয়ে বলতেছে ৫০ লাখ টাকা দেন, একটা ছবি বানান। ১০০ হলে রিলিজ পাবে। প্রথম সপ্তাহেই ১ কোটি টাকা ইনকাম করবেন। তারা না বুঝেই ইনভেস্ট করে ফেলছে। আর আরেকটা গ্রুপ হচ্ছে পুরনো প্রযোজক, যারা আগে থেকেই জেনুইন ব্যবসা করার জন্য আসছে।

তবে এখন ইন্ডাস্ট্রিতে দুই ধরনের মানুষ বেশি আসছে, তারা হচ্ছে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের দিকে আকৃষ্ট হয়ে আরেকটা শ্রেণি হচ্ছে বোকা হয়ে। জেনুইন ব্যবসা করার জন্য কেউ আসছে না।আর পুরনো প্রযোজকরা এখন আর সিনেমা বানাচ্ছে না। যাদের কাজই সিনেমা বানিয়ে আয় ইনকাম করা, খাওয়া দাওয়া করা, তারা সিনেমা বানাতে আসছে না।

 

প্রিয়.কম: পুরনো প্রযোজকদের সঙ্গে তো আপনার ভাল সম্পর্ক-ফিল্মে বিনিয়োগ না করার পেছনে তাদের মনোভাব কি?

আজিজ: তাদের মনোভাব হচ্ছে, লস দিয়ে তারা সিনেমা বানাতে চাচ্ছে না। ধরেন সাইদুর রহমান মানিক ১ কোটি টাকা দিয়ে ছবি বানিয়ে ২০ লাখ টাকাও ফেরত পায় নি। লিপু ভাইয়ের ‘ব্ল্যাক’ ছবিটাতেও উনি খরচ করেছেন প্রায় ১ কোটি টাকা। কিন্তু এখানেও প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লস হবে। দীপু ভাইয়ের অ্যাকশন জেসমিনেও লস হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।ওয়াজেদ আলি সুমনের ছবিতেও ৪০ লাখ টাকা লস।

প্রিয়.কম: এই লস থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আজিজ: এই লস থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে মার্কেট স্টাডি করা। ভাল ছবি নির্মাণ করা। রেড অ্যালেক্সা ক্যামেরার যুগ থেকে আরও ভাল কিছুর দিকে যেতে হবে। কলকাতার মার্কেট, বোম্বের মার্কেট এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছবি নির্মাণ করতে হবে। কারণ মাকের্ট তো ওপেন হয়ে গেছে। টিভির পর্দায় চোখ রাখলেই সব দেখা যাচ্ছে। ফলে সেই মার্কেটের কথা বিবেচনায় রেখে আমাদের সিনেমারও উন্নয়ন করতে হবে। জয়েন ভেঞ্চার কিছু কাজের ভেতর দিয়ে আমাদের টেকনিশিয়ানদের ডেভলপ করতে হবে।

প্রিয়.কম: জাজ সিনেমা হলগুলো  ডিজিটাল করছে-এটা ভাল বিষয়। কিন্তু ডিজিটাল মেশিনের ভাড়া বাবদ প্রযোজকদের প্রচুর টাকা গুনতে হয় যেটা আগে ছিলো না। এ কারণে জাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, জাজ সবকিছু কুক্ষিগত করে রেখেছে।এই অভিযোগ খন্ডন করবেন কিভাবে?

আজিজ: এখানে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো ব্যাপার নেই।আমি কুক্ষিগত করতে নয়, ব্যবসা করতে এসেছি। ব্যবসার দরজা সবার জন্যই খোলা আছে। ওপেন মার্কেট। যে কেউ চাইলেই ডিজিটাল মেশিন বসাতে পারে।তারাও ব্যবসা করতে পারে। যারা এসব বলছে তারা কেন ডিজিটাল মেশিন বসাচ্ছে না।তাদের অন্তত পাঁচটা মেশিন বসাতে বলেন। আমি এখানে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করেছি। ব্যবসা করার জন্যেই তো। আমি আগেও বলেছি, আমি ব্যবসা করতে এসেছি, জনসেবা করতে নয়। আমি এর আগেও বলেছি শিল্পসাহিত্য করতে ফিল্মে আসিনি ব্যবসা করতে এসেছি।সো এটা ওপেন মার্কেট। তারাও আসুক।আর যারা এসব বলে বেড়াচ্ছে তারা তো বাড়ি গাড়ি করেছে সিনেমা থেকেই।তারা কেন সিনেমার উন্নয়নে ডিজিটাল মেশিন বসাচ্ছে না।

প্রিয়.কম: যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করছেন, বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটা কতটা ইতিবাচক?

আজিজ: আমাদের যৌথ প্রযোজনার ছবি রোমিও বনাম জুলিয়েট, অগ্নি-২, ‘আশিকী’ বেশ ভালো ব্যবসা করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় যৌথ-প্রযোজনার সবগুলো ছবিই ভালো ব্যবসা করেছে। একমাত্র ‘ব্ল্যাক’ ছবিটি ব্যবসা করে নি। সেটাও আগেই পাইরেসি হয়ে যাওয়ার কারণে লস হয়েছে।

প্রিয়.কম: কিন্তু যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে তো অনিয়ম হচ্ছে প্রচুর। মানা হচ্ছে না নীতিমালা। কামাল মোহাম্মদ কিবরিয়া লিপু তো কলকাতার প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অনেকে আবার বলছেন যৌথ প্রযোজনার ব্যবসাটাও প্রপার ওয়েতে হচ্ছে না-এসবের কারণ কি?

আজিজ: আমি যা করছি সবগুলোই প্রপার ওয়েতে হচ্ছে।আমাদের কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী ঐ দেশে যা হবে আর্টিস্টসহ শুটিং কষ্ট তারা দিবে আর আমাদের দেশে আমরা দিবো-এটাই হচ্ছে ওদের সঙ্গে আমার কন্টাক্ট।

প্রিয়.কম: জাজের ছবির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে সমান সংখ্যক শিল্পী বা কলাকুশলী রাখা হচ্ছে না?

আজিজ: ঠিকভাবে হিসেব করলে সমান সংখ্যকই পাবেন। এর মধ্যে ‘অগ্নি-২’ এর ডিরেক্টর কিন্তু বাংলাদেশ থেকেই ছিলো। ওরা কিন্তু ডিরেক্টর দেয় নাই।

প্রিয়.কম: ‘আশিকী’, ‘রোমিও বনাম জুলিয়েট’ এ কিন্তু ঠিক নেই?

আজিজ: ‘আশিকী’তে মেইন ক্যারেক্টার একটু কম হলেও অন্যান্য ক্যারেক্টার দিয়ে সেটা উৎরে গেছে। আর কিছু কিছু ক্যারেক্টার আছে তারা বাইরের। তারা বাংলাদেশেরও না ভারতেরও না। আর মেইন ক্যারেক্টার বেশি করেছে ইন্ডিয়ান আর্টিস্টরা। আমাদের ছবিগুলোতে ছোট-বড় সব আর্টিস্ট-এর কোয়ান্টিটি কাউন্ট করলে সেটা সমান সংখ্যকই পাবেন। আবার অঙ্গারের ক্ষেত্রে টোটাল ৪৪ জনের মতো অভিনয় করেছে। এর মধ্যে শুধু চারজন কলকাতার।

প্রিয়.কম: যৌথ-প্রযোজনার নীতিমালায় আছে ছবি দুই দেশের হলেও নিজ দেশের ভাষা-সংস্কৃতিকে যেন তুলে ধরে। ‘আশিকী’ ছবিতে দেখা যায় পাত্র-পাত্রীদের হিন্দি সংলাপ আওড়ানোসহ পুরো বিষয়টিই ইন্ডিয়ান ছবি হিসেবেই মনে হয়েছে। এই অভিযোগ কীভাবে খন্ডাবেন?

আজিজ: আমাদের সংস্কৃতিকে ছবিতে তুলে ধরা হয় নি, এটা জাজের দোষ নয়। এটা সরকারের দোষ। কারণ আমার বাচ্চা মেয়েটা বৃষ্টিকে বলে বারিশ।যদিও এখন সে বৃষ্টি বলে। ছোটবেলায় সে ডোরিমন দেখতো তাই বৃষ্টিকে বারিশ বলতো। এটা কোন সংস্কৃতি থেকে এলো। আমাদের রাস্তায় বেরুলো অনেক ছেলে মেয়েই হিন্দিতে মশকরা করে। সরকার এই দিকগুলো ঠিক না করলে তো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হবেই।

প্রিয়.কম: কিন্তু সরকারি নীতিমালা বলছে যে, যৌথ-প্রযোজনার ছবি হলে অবশ্যই নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে, কিন্তু ‘আশিকী’তে আমরা সেটি পাই নি?

আজিজ: বাংলা সংস্কৃতিকে খুব একটা অপেক্ষা করে গেলাম কোথায়? আর বলেন তো বাংলা কোন সিনেমাটা বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। অনেক ছবিতেই আপনি দেখতে পাবেন হিরো হিরোইন শয়তানি করে হিন্দিতে কথা বলছে।ভারতীয় ছবির হুবহু কপি পেস্ট হচ্ছে প্রায় সব ছবিতেই। সেখানে তো সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্ন উঠছে না। আর আমাদের টা তো যৌথ প্রযোজনার ছবি। ‘আশিকী’ ছবিতে একটা শিখ লোককে দেখানো হয়েছে। শিখ লোক তো হিন্দিতেই কথা বলবে।

প্রিয়.কম: আপনি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছেন যে আপনি কলকতার বাজার দখল করবেন।সে কারণেই যৌথ-প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করছেন? কিন্তু এক্ষেত্রে তো উল্টোটাও ঘটতে পারে। কলকতার বাজার দখল করতে গিয়ে দেখা গেল ওরাই বাংলাদেশের বাজার দখল করে ফেললো? এই আশঙ্কার ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

আজিজ: জয়েন ভেঞ্চারে ছবি করলে তা হবে না। কারণ ওদের সবাইকে আমরা চিনি। কিন্তু আমাদের আর্টিস্টদের কেউ চিনেন না। মাহি ঢাকার রাস্তায় হাঁটলে তাকে ঘিরে ভিড় জমে যায়, ভিড়ের ঠেলায় সে চলতে পারে না। অথচ কলকাতায় হাঁটলে তাকে কেউ চিনেই না। আমাদের আর্টিস্টদেরকে আগে পরিচিত করতে হবে। বাংলাদেশে জাজের যেমন একটা ব্রান্ড ভেলু তৈরি হচ্ছে তেমনি ডিরেক্টর আর্র্টিস্টদেরও ব্রান্ড ভ্যালু তৈরি হচ্ছে। কলকাতার মানুষও আমাদের চিনছে। আস্তে আস্তে আমরা নিজেরাই কলকাতায় ছবি রিলিজ দিতে পারবো। আমাদের ইচ্ছে আছে কলকাতায় জাজের একটি অফিস দেওয়ার।সেটার নাম হবে জাজ ইন্ডিয়া।

প্রিয়.কম: আপনি বলেছেন, কলকাতায় জাজের ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তাদের পোস্টার, ট্রেইলার এবং প্রচারণায় কিন্তু জাজের নাম যাচ্ছে না। সেক্ষত্রে ব্যান্ড ভ্যালু তৈরি হবে কী করে?

আজিজ: যাচ্ছে না যে তা একেবারে নয়, ছোট আকারে যাচ্ছে। আর ভবিষ্যতে এটা আরও বড় আকারে যাবে। আর সেখানকার মিডিয়া, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষরা কিন্তু ঠিকই জানছে, ছবিগুলোর কো-পার্টনার জাজ। এখন ম্যাসিভ আকারে না জানলেও একদিন সর্বস্তরের মানুষের কাছে জাজের নাম পৌঁছে যাবে।

প্রিয়.কম: যৌথ-প্রযোজনার ছবিতে আমাদের এখান থেকে যে হারে নায়িকা নেওয়া হচ্ছে সে তুলনায় নায়ক নেওয়া হচ্ছে না।কেন? এটার মনস্তত্বটা কী?

আজিজ: এটার মনস্তত্ব হচ্ছে ওদের নায়করা জনপ্রিয় বেশি।আমাদের নায়িকারা জনপ্রিয় বেশি। বিজনেসের মূল বিষয় হচ্ছে পপুলারিটি। আমরা পপুলারিটি সেল করি। অবশ্য এবার আমরা আরিফিন শুভকে নিলাম।

প্রিয়.কম: এটা তো একেবারে শেষে এসে?

আজিজ: না, এর আগে কাকে নিবো বলেন? আমরা তো শিপনকে তৈরি করার চেষ্টা করলাম কিন্তু শিপন দাঁড়াইলো না। আমরা সবসময় এক্সক্লুসিভ কিছু করার চেষ্টা করি।

প্রিয়.কম: জাজ নতুনদের তৈরি করছে ঠিক, কিন্তু ব্যাপক হারে তৈরি করছে না। এক্ষেত্রে কোন রিয়ালিটি শো’র আয়োজন করে বা ট্যালেন্ট হাণ্ট প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আপনারা করতে পারেন। এটা কেন করছেন না?

আজিজ: এটা লাক্স চ্যানেল আই বা অন্যরা এটা করতে পারে।আমাদের এটা ব্যবসা না। আমরা একজনকে পছন্দ করবো তাকে তুলে ধরবো। আমরা শিপনকে ঠিক করেছিলাম।তার ইন্ডিয়ায় ট্রেইনিংয়ের পিছেই বিশ লাখ টাকা খরচ করেছি। কিন্তু আমি ফেল করেছি। ওর আগ্রহ ছিল না।এরপর তো আর কাউকে নায়ক বানানোর মতো পাচ্ছি না। নায়কদের নায়কসুলভ ভঙ্গি থাকতে হবে। সে আগ্রহটা থাকতে হবে। সে রকমের লুক থাকতে হবে। হিরো হিরোর মতো হতে হবে সে চেহারাটা আমি পাচ্ছি না।

আমরা ফেসবুকেও ক্যাম্পেইন করছি নতুন নায়ক নেওয়ার জন্যে। জাজের পেইজে পোস্ট দিয়েছি। হিরো হাণ্টিং করছি। সেখানে আমরা নতুন হিরো হাণ্টিং এর কাজ শুরু করে দিয়েছি।

প্রিয়.কম-এর ভিডিও সাইট ‘স্ক্রিণ.প্রিয়.কম’ দেখছেন আব্দুল আজিজ।

প্রিয়.কম: হলের পরিবশে ঠিক করতে জাজ কোন উদ্যোগ নিবে কিনা?

আজিজ: এটা সরকারের দায়িত্ব, হল মালিকদের দায়িত্ব। আমার পক্ষে এটা সম্ভব না। আর এই কাজটা করতে পারে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো।হল মালিক সমিতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অবশ্য আমাদের চলচ্চিত্রের যে সমিতিগুলো আছে এরা ক্ষমতালোভের কারণে সমিতিগুলোকে অকার্যকর করে রাখছে।এদের জন্যই আজ চলচ্চিত্রের দুর্দশা। সমিতি ঠিক থাকলে নিয়ম নীতি ঠিক থাকবে।

প্রিয়.কম: আপনারা সিনেপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন, এই প্রকল্প কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে?

আজিজ: আমাদের প্ল্যান আছে। সরকার জমি দিলে আমরা সিনেপ্লেক্স করবো। আমাদের বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। আমরা সিনেপ্লেক্স নির্মাণের পর বোম্বেতে সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিবো।

প্রিয়.কম: বাণিজ্যিক ফিল্মের পাশাপাশি আর্টফিল্ম বানানোর ইচ্ছে আছে কিনা?

আজিজ: না, আমাদের আর্টফিল্ম বানানোর কোনো ইচ্ছে নেই। পুরস্কার পাওয়ার জন্য আমরা সিনেমা বানাই না।

প্রিয়.কম: কিন্তু ভিন্ন ধরনের ছবিও তো ব্যবসা করে?

আজিজ: আমি যদি মনে করি ভিন্নপেটার্নের গল্প নিয়ে ছবি বানালে ব্যবসা হবে তাহলে অবশ্যই ভিন্ন প্যাটার্নের ছবি বানাবো। এর আগে ‘দবির সাহবের সংসার’ বানিয়েছি ভিন্ন টাইপের গল্প নিয়ে। পোড়ামন, অঙ্গারও ভিন্ন ধরনের ছবি।

প্রিয়.কম: ইন্টেলেকচুয়াল ফিল্ম?

আজিজ: ভিন্ন টাইপের হোক, ইন্টেলেকচুয়াল হোক যে ছবি ব্যবসা করবে সেই ছবিই আমরা বানাবো।

প্রিয়.কম: কাকরাইল পাড়া সূত্রে জানতে পেরেছি জাজের ছবিও নাকি ব্যবসা করছে না, তাহলে জাজ কিভাবে সারভাইভ করছে?

আজিজ: জাজের ছবিও তেমন ব্যবসা করে না। এটা ঠিক। জাজের বিভিন্ন সাইট ব্যবসা আছে। প্রজেক্টর ভাড়া পাই। ক্যামেরা ভাড়া দেই। এডিটিং প্যানেল আছে। সবগুলো মিলিয়েই চলতে পারছি। আমি সিনেমাতে লস করি। কিন্তু আদার সাইটগুলো থেকে লাভ করি। সব মিলিয়ে জাজ সারভাইভ করতে পারছে। তাই আমি বলছি যদি কেউ জাজ হতে পারে তাহলে ব্যবসা করবে আর না হলে ব্যবসা করবে না। ফলে কেউ এখন যদি ছবি বানাতে আসে তাহলে করপোরেট লেভেলের পুঁজি নিয়ে আসতে হবে। ১ কোটি দুই কোটি টাকা নিয়ে সিনেমায় নামলে লস হবে। মিনিমিাম ৪০-৫০ কোটি টাকা নিয়ে সিনেমায় নামতে হবে। করেপোরেট লেভেলে ব্যবসা করতে পারলেই সিনেমায় লাভজনক হবে।

প্রিয়.কম: সবাই প্রায় একই কথা বলছে সিনেমা চলছে না, সিনেমায় এই করতে হবে, সেই করতে হবে । কিন্তু হবেটা কবে?

আজিজ: যেদিন আমাদের এখানে সঠিক নেতৃত্ব আসবে। সেদিনই সব হবে।

প্রিয়.কম: যৌথ প্রযোজনার যে নীতিমালা আছে সেই নীতিমালা ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক?

আজিজ: নীতিমালায় কিছু যোগ-বিয়োগ করা উচিত। যেমন ভারতের একজন পরিচালক আবার বাংলাদেশের একজন পরিচালক থাকতে হবে এটা ঠিক না। শিল্পী কলাকুশলী ঠিক আছে। নীতিমালাটা আরেকটু সহজ করা উচিত। পরিচালক দুজন থাকতে পারে না। আর্র্টিস্ট সমান থাকবে এটা ঠিক আছে।

প্রিয়.কম: নায়ক-নায়িকা গড়ে তুলছেন কিন্তু পরিচালক, স্ক্রিপ্ট রাইটার তৈরি করছেন না। এক্ষেত্রে আপনারা কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?

আজিজ: চেষ্টার কোনো ত্রুটি করা হয় নাই। মানুষকে মাসের পর মাস সময় দিয়েছি।এদিকে ফারুক হোসেনকে অনেক চেষ্টা করে দাঁড় করিয়েছিলাম। কিন্তু ও তো মারা গেল। সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হতে হলে তাকে সিনেমা বুঝতে হবে। সিনেমার প্যাশন থাকতে হবে। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা সহজ না। নায়ক-নায়িকা কি করবে, কোথায় শুটিং হবে, বাজেট কত হবে এগুলোও তাকে বুঝতে হবে। স্ক্রিপ্ট লেখার পর তাকে বুঝতে হবে যে সে কত টাকার স্ক্রিপ্ট লেখছে।এগুলো বোঝার জন্য তাকে আগে একজন সিনিয়ররের সঙ্গে কাজ করতে হবে।অনেক মিউজিক ডিরেক্টরকে আমরাই প্রমোট করেছি। প্রত্যেকটা মিউজিক ডিরেক্টরই সিনিয়রদের সঙ্গে কাজ করছে। সিনেমার প্রতিটি সেকশনই হচ্ছে গুরুবিদ্যা। সিনেমায় নতুন যারা আসতেছে, তারা সবাই মনে করছে আমরা সবকিছুই জানি। তারা সবাই ভরা কলস হয়ে আসতেছে। ফলে তাদেরকে স্থান দেওয়া যায় না। সিনেমায় যদি তারা আসতে চায় তাহলে ভরা কলসটা খালি করে আসতে হবে।

প্রিয়.কম: আপনারা শর্টফিল্ম বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন? তো এই প্রজেক্টের কি খবর?

আজিজ: আমরা দশজনকে নিয়ে শর্টফিল্ম বানানোর চিন্তা করছিলাম। কিন্তু আমরা কোয়ালিফায়েড করতে পেরেছি মাত্র পাঁচজনকে। তাদের পাঁচজনকে ডাকা হয়েছে, তারা আসবে। তারা যদি ভাল বানাতে পারে তাহলে আমরা তাদের সুযোগ দিবো। এমনকি সিনিয়র পরিচালক যেমন জাকির হোসেন রাজুর মতো পরিচালকদের সহকারি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিবো। এটা হচ্ছে ডিরেক্টর তৈরি করার জন্য আমাদের পরিকল্পনা।

আমি মনে করি নাটকের ডিরেক্টর দিয়ে সিনেমা হবে না। যে অন্তত প্রথম তিনটি ছবি অ্যাসিস্ট্যান্সি করে নাই, সে সিনেমা বানাতে পারবে না। আগে পূর্ণ ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করে অন্তত তিনটি ছবি নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছেলেকে নিয়েছি, সে জাকির হোসেন রাজুর সঙ্গে অ্যাসিস্ট করছে। আমরা এভাবে পরিচালক বানানোর চেষ্টা করছি।

প্রিয়.কম:  জাজের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ শোনা যায় যে, জাজ হাতে গোনা কয়েকজন পরিচালকের সিন্ডিকেট বানিয়েছে এর বাইরে কোনো পরিচালককে তারা নিতে চায় না। এটা একটা সিন্ডিকেট জাজে ভর করে আছে-এটা নিয়ে কি বলবেন?

আজিজ: জাজে যারা ছবি বানাচ্ছে তাদের আমি কোয়ালিফায়েড মনে করেছি বলেই কাজ দিয়েছি। কারণ তারা তো আমার ভাই-ব্রাদার না। ওযাজেদ আলী সুমন যেমন আমার আত্মীয় না, তেমনি জাকির হোসেন রাজুও আমার আত্মীয় না। আর যারা কাজ করে তারাও আমার আত্মীয় না। অনেক ডিরেক্টরই আছে যাদের একটা ছবির পর আর কোনো ছবি দিই নাই।

প্রিয়.কম: জাজের বেশিরভাগ ছবিই প্রায় নকল ছবি থেকে তৈরি। মৌলিক ছবি নিয়ে কাজ করছেন না কেন?

আজিজ: আমরা ইলিগ্যাল কোনো কাজ করি না। প্রত্যেকটা ছবিই কপিরাটইট আনা। আর মৌলিক গল্পের ছবি বানিয়েছি। কিন্তু সেগুলো ভাল চলেনি। যেমন ‘দবির সাহবের সংসার’ মৌলিক গল্প। ‘দেশা-দ্য লিডার’ মৌলিক গল্প। কিন্তু চলেনি।আমার নকল গল্পগুলোই ব্যবসা করেছে। যেমন ‘পোড়ামন’ একটা নকল গল্প। কপি গল্পগুলোই বেশি চলেছে।

প্রিয়.কম: সেক্ষেত্রে ব্যবসা সফল মৌলিক গল্পের সমস্যাগুলো দূর করে ব্যবসাসফল মৌলিক ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা?

আজিজ: আমরা মৌলিক গল্প নিয়ে কাজ করতে চেযেছি। কিন্তু মৌলিক গল্প যেগুলো পছন্দ হয় সেগুলো আমরা পাই না। যেমন হুমায়ূন স্যারের গল্পগুলোর রাইট আমাদের দিবে না। কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজের গল্পগুলো নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে চেয়েছি, সেগুলো তারা দেয় নি। ভালোবাসার রং কিন্তু কাজী আনোযার হোসেনের একটা গল্প থেকেই নেওয়া। উনি রাইট দিতে চাননি। পরে আমরা গল্পের থিম চুরি করে বানিয়ে ফেলেছি। এখন মৌলিক গল্প পাবো কোথায়?

প্রিয়.কম: সেক্ষেত্রে মৌলিক গল্পের প্রতিযোগিতা বা সার্চিং এর মাধ্যমে তা করতে পারেন?

আজিজ: প্রতিযোগিতায় কনসেপ্ট পাওয়া যায় কিন্তু লেখক পাওযা যায় না। কনসেপ্ট এক জিনিস।আর স্ক্রিপ্ট লেখা আরেক জিনিস। একটা গল্প বললেই হলো না। সেটা সঠিক রূপও দিতে হবে।

প্রিয়.কম: তো মৌলিক গল্প ছাড়া কি একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দাড়াতে পারবে? আপনি কি মনে করেন?

আজিজ: তা জানি না, তবে আমরা যা দিতে চেয়েছি তা দর্শক নেয় নি।

প্রিয়.কম: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আজিজ: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...