ছবি সংগৃহীত

তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রার্থনা: মুহম্মদ জাফর ইকবাল

খুব সহজে আমার মন খারাপ হয় না কিন্তু গত কয়েদিন থেকে আমার খুব মন খারাপ। যারা এক নজর পত্রিকার দিকে তাকাবে কিংবা টেলিভিশনে খবর শুনবে তাদেরও মন খারাপ হয়ে যাবে।

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৪, ১৩:৪৬ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:২৪
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৪, ১৩:৪৬ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:২৪


ছবি সংগৃহীত
খুব সহজে আমার মন খারাপ হয় না কিন্তু গত কয়েদিন থেকে আমার খুব মন খারাপ। যারা এক নজর পত্রিকার দিকে তাকাবে কিংবা টেলিভিশনে খবর শুনবে তাদেরও মন খারাপ হয়ে যাবে। শুধু মাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে এই দেশে মানুষের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ভয়ে আতংকে জীবন বাঁচাবার জন্যে এই মানুষগুলো নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। বাড়ির মেয়েদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। ১৯৭১ সালে হিন্দু মুসলমান সবাই আক্রান্ত হয়েছিল। মুসলমান হলে তখনও কখনো হয়তো মানুষ বেঁচে গিয়েছে কিন্তু হিন্দু হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকে কেউ কখনো প্রাণে বেঁচে ফিরে আসেনি। ১৯৭১ সালে আমরা গ্রামে লুকিয়ে আছি তখন দেখেছি একজন হিন্দু মা তার শিশু সন্তানকে বুকে চেপে ধরে স্বামীর পিছু পিছু ছুটে যাচ্ছে। তাদের চোখ মুখের সেই উদভ্রান্ত অসহায় দৃষ্টি আমি কখনো ভুলতে পারব না। তেতাল্লিশ বছর পর এই বাংলাদেশে কখনো একজন অসহায় হিন্দু মা তার সন্তানকে বুকে চেপে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ছুটে যাচ্ছে। তার মনে যে দেশকে নিয়ে আমরা এতো গর্ব করি সেই দেশটি আসলে তেতাল্লিশ বছরে এক ইঞ্চিও সামনে আগ্রসর হয়নি। এর চাইতে বড় দুঃখ লজ্জা আর অপমান কী হতে পারে? আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি আমি যদি এই দেশে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হতাম তাহলে আমার কেমন লাগতো। আমি জানি তাহলে গভীর হতাশায় আমার বুক ভেঙ্গে যেতো। আমি কোনো দোষ করিনি কিন্তু শুধুমাত্র একটি হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে আমার উপর যে নৃশংস অত্যাচার করা হচ্ছে তার জন্যে আমার বুকে যেটুকু ক্ষোভ জন্ম নিতো তার চাইতে শতগুণ বেশি অভিযোগ হতো আমার চারপাশের নির্লিপ্ত মানুষজনকে দেখে। কেউ কোনো কথা বলছে না। নীরবে এক ধরনের করুণা নিয়ে আমাকে দেখছে। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ হতো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। প্রতিবার নির্বাচনের পর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় হবার পর, রায় কার্যকর হবার পর আমাদের ওপর হামলা করা হবে। বি.এন.পি জামায়াত হামলা করবে, আওয়ামী লীগ বা বাম দলগুলো সেটা ঘটতে দেবে। খুব বেশী হলে নিরাপদ দুরত্বে থেকে প্রতিবাদ করবে কিন্তু বুক আগলে কেউ রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না। এই দেশে আমি যদি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমার বার বার মনে হতো আমি এই দেশের মানুষ কিন্তু এই দেশটি আমাকে রক্ষা করছে না। আমি নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করে বলতাম তুমি কেন আমাকে এমন একটি দেশে জন্ম দিয়েছ যেই দেশ আমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয় না? যেই দেশে আমাকে প্রতি মুহূর্তে আতংকে থাকতে হয়? কিন্তু আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী নই, তাই প্রকৃতপক্ষে তাদের বুকের ভেতর যে গভীর দুঃখ ক্ষোভ হতাশা আর অভিমান পুঞ্জীভূত হয়ে আছে আমি সেটা কোনোদিন অনুভব করতে পারব না। আমাদের প্রিয় দেশটি নিয়ে আমাদের কতো কল্পনা, কতো স্বপ্ন। আমরা আশা করে আছি আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে, জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে যাবে একদিন দেশটা মাথা তুলে দাড়াবে। আমরা এর মাঝে সেগুলো এই দেশে শুরু হতে দেখেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কাছে সবকিছু অর্থহীন বলে মনে হচ্ছে। যদি আমরা একজন মানুষকে শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার জন্যে এই দেশে তাকে নিরাপত্তা দিতে না পারি তাহলে এই দেশটি কাদের জন্যে ? আমার মনে হয় এই দেশ নিয়ে আমাদের যত কল্পনা, যত স্বপ্ন, যত পরিকল্পনা সবকিছুকে পিছনে সরিয়ে সবার আগে আমাদের এখন একটি লক্ষ্য টেনে নিয়ে আসতে হবে। সেই লক্ষ্যটি হচ্ছে এই দেশে একটি হিন্দু শিশু যেন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় তার মায়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে পারে। গভীর রাতে ধর্মান্ধ মানুষের উন্মত্ত চিৎকারে তাদের যেন উঠতে না হয়, আগুনের লেলিহান শিখায় আপনজনের আতংকিত মুখ দেখতে না হয়। একজন হিন্দু কিশোরীকে যেন তার বাবার রক্তশূন্য মুখের দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাপঁতে কাপঁতে বলতে না হয়, "এখন কী হবে বাবা?" আমরা পদ্মা সেতু চাই না, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই না, যানজট মুক্ত বাংলাদেশ চাই না, শত ভাগ নিরক্ষর চাই না, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ চাই না শুধুমাত্র হিন্দু এবং অন্য সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা চাই যেন তারাও ঠিক আমাদের মত এই দেশটিকে তাদের নিজেদের ভালোবাসার দেশ বলে ভাবতে পারে। তীব্র অভিমানে তাদের বুক ভেঙ্গে যেন আর কোনদিন খান খান হয়ে না যায়। আমি কার কাছে এটি চাইব জানি না, তরুণ প্রজন্মের কাছে চাইছি। তোমরা আমাদেরকে একটি নূতন বাংলাদেশ উপহার দাও। যে বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিষবাষ্প চিরদিনের জন্যে মুছে দেওয়া হবে। আমি জানি তোমরা পারবে।