সফিউল আলম রাজা: ছবিটি নেওয়া হয়েছে তার ফেসবুক পেজ থেকে।

ভাওয়াইয়া শিল্পী ও সাংবাদিক সফিউল আলম রাজা আর নেই

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সফিউল আলম রাজার মরদেহ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তার দাফন সম্পন্ন হবে।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৭:৪১ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১২:২১
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৭:৪১ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১২:২১


সফিউল আলম রাজা: ছবিটি নেওয়া হয়েছে তার ফেসবুক পেজ থেকে।

(প্রিয়.কম) ভাওয়াইয়া শিল্পী ও সাংবাদিক সফিউল আলম রাজা মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর।

১৭ মার্চ, রবিবার রাজধানী ঢাকার পল্লবীর সাড়ে ১১ নম্বর সড়ক এলাকায় তার নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’তে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এটি ‘কলতান গানের স্কুল’ নামেই পরিচিত। এখানেই একটি কক্ষে তিনি থাকতেন।

১৬ মার্চ, শনিবার রাতে এশিয়ান টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সফিউল আলম রাজা নিজ ঘরে ফেরেন। রবিবার দুপুরের দিকে তার স্কুলের দরজা বন্ধ থাকায় ডাকাডাকি করা হয়। কোনো সাড়া না পাওয়া গেলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, তিনি শুয়ে আছেন। অনেক ডাকাডাকির পর না উঠলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মিরপুর ও রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জানাযার পর সফিউল আলম রাজার মরদেহ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তার দাফন সম্পন্ন হবে। রাজা তার স্ত্রী, এক মেয়ে, এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্বীয়-স্বজন রেখে গেছেন।

সফিউল আলম রাজা সর্বশেষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয়.কমের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতার পাশাপাশি সফিউল আলম রাজা বিভিন্ন গণমাধ্যমের শ্রোতা-দর্শকদের কাছে ‘ভাওয়াইয়া রাজা’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ভাওয়াইয়া গানের এই শিল্পীর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায়। কৈশোরে পিতা মরহুম নাজমুল হক ও মাতা মরহুমা শামসুন্নাহার বেগমের উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণায় তার গান শেখা শুরু। সংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তবে ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি-গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী নুরুল ইসলাম জাহিদের কাছে সংগীতের তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন রাজা। তিনি বাংলাদেশ বেতারের ‘বিশেষ’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘প্রথম’ শ্রেণির শিল্পী ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি দেশের সব কটি চ্যানেলে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে আসছিলেন। সংগীত পরিবেশন করছেন বিদেশি বিভিন্ন মঞ্চ এবং মিডিয়াতেও (এরমধ্যে কলকাতার তারা মিউজিক এবং কলকাতা টিভি উল্লেখযোগ্য)।

লোকসংগীতের অন্যতম ধারা ভাওয়াইয়া গানের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে শিল্পী রাজা ২০০৮ সালে রাজধানীতে ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভাওয়াইয়া স্কুল’। যে স্কুলে ভাওয়াইয়ার ওপর এক বছরের ফ্রি সার্টিফিকেট কোর্স করানো হয়। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি সংস্কৃতির সকল শাখা নিয়ে রাজধানীর পল্লবীতে ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এই শিল্পী। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘উত্তরের সুর’-এ চারটি মৌলিক ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন।

শিল্পী জীবনে স্বীকৃতি স্বরূপ সফিউল আলম রাজা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণে লোকসংগীত বিভাগে (ভাওয়াইয়া নিয়ে) ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। রাজধানীতে এ পর্যন্ত রাজার ছয়টি একক সঙ্গীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দুটি, আঁড়িয়াল সেন্টারের উদ্যোগে একটি, আঁলিয়স ফ্রঁসেজের উদ্যোগে একটি, গুরুর চিকিৎসা সহায়তায় ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল-এর আয়োজনে একটি এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে একটি একক সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে রাজার একটি মিক্সড অ্যালবাম এবং ভায়োলিন মিডিয়া থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে একক ভাওয়াইয়া অ্যালবাম ‘কবর দেখিয়া যান’। সংগীত নিয়ে সফর করেছেন অষ্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। তিনি সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে ‘বিচারক’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পী সফিউল আলম রাজা পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন। ঢাকা রি‌পোর্টার্স ইউ‌নি‌টির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য শফিউল আলম রাজা সংগঠনটির সাংস্কৃ‌তিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক জনতা, দৈনিক অর্থনীতি, দৈনিক যুগান্তর এবং সর্বশেষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয়.কমের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। পেশাগত জীবনেও তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। সাংবাদিকতায় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুরস্কার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, ডেমোক্রেসি ওয়াচ হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, ইউনেস্কো ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

নিজের জন্মস্থান কুড়িগ্রামের চিলমারীর বন্দরে শান্তি নিকেতনের আদলে একটি ভাওয়াইয়া ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন সফিউল আলম রাজা।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল