ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের একটি চিত্র। ফাইল ছবি

দালাল চক্রের কাছে জিম্মি ঢামেক হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা

নগরীতে বিভিন্ন হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এর মধ্যে অবৈধ এক হাজারেও বেশি। সেবা নয়, টাকার জন্যই এ অ্যাম্বুলেন্স।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:৫৮ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:০৭
প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:৫৮ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:০৭


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের একটি চিত্র। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) সরকারি হাসপাতালগুলোতে কমবেশি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না। আর পেলেও অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হয় বলে অভিযোগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের। চিকিৎসাসেবা নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়তই রোগী আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

রোগীদের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সুযোগে তৈরি করে রেখেছে একটি বেসরকারি ‘অ্যাম্বুলেন্স চক্র’; যারা অনেক সময় সেবার নামে রোগীর সঙ্গে করে প্রতারণা। কিন্তু নেই অনিয়মের কোনো প্রতিকার। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সগুলোকেও ব্যবহার করে সরকারি হাসপাতালগুলো। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দালালদের ভিজিটিং কার্ডেও ঠিকানা থাকে বড় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের। এ ব্যবসা মূলত চালু রাখে দালালরা

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সে তুলনায় অ্যাম্বুলেন্স নেই; যা আছে তার সেবাও রাজধানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই ঢাকার বাইরের রোগীদের বাধ্য হয়ে অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য দালাল চক্রের ওপরই নির্ভর করতে হয়।আর অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রী ঠিক করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে ২০-২৫ দালাল। তারা রোগী নিয়ে দরকষাকষী-টানাটানিতে ব্যস্ত থাকে।

নগরীতে বিভিন্ন হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এর মধ্যে অবৈধ এক হাজারেও বেশি। সেবা নয়, টাকার জন্যই এ অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালে রোগী এলেই জমে ওঠে দালাল চক্রের রমরমা বাণিজ্য। এসব চক্রের লোকজন কৌশলে রোগীদের বাধ্য করে ওইসব অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে।

অকেজো, ব্যবহার অযোগ্য-ফিটনেসবিহীন গাড়ি দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সেবার নামে প্রতারণা চালিয়ে আসছে একাধিক সিন্ডিকেট। এর সঙ্গে জড়িতরা বেশির ভাগেরই মালিক হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, ওয়ার্ডবয় ও ওয়ার্ড মাস্টাররা। এরা গড়ে তুলেছেন ট্যাক্সি ও প্রাইভেট কার মালিক সমবায় সমিতি। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও হয়রানি ছাড়া তা পান না রোগীরা।

বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন জামালপুর থেকে আসা ওসমান গনি। তার অভিভাক রুহুল আমীন বলেন, ‘এক মাসের ওপরে এখানে আছি। আ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এখানে দালালরা যে আচরণ রোগীর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে করে তা মোটেও সেবার পর্যায়ে পড়ে না। আমি শুধু এতটুকু বলব যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব জানেন। জেনেও হাসপাতালগুলোর প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছেন। মোটাদাগে বলতে গেলে প্রশাসনের সামনেই চলছে এসব অনিয়ম।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে দিনের পর দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট, শিশু হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের আশপাশের রাস্তায় নানা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নামে অনেক অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং করে রাখতে দেখা যায়। হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন রোগী ও লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে টানাহেঁচড়া করতে দেখা যায়। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন চক্র। মেডিকেলের নিজস্ব কোনো অ্যাম্বুলেন্স সেবা না থাকায় রোগীদের জিম্মি করে ব্যবসা করে আসছে একটি চক্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেকের ইউরোলজি বিভাগের এক কর্মচারী জানিয়েছেন, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সঙ্গে হাসপাতালের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও জড়িত। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে আসা অ্যাম্বুলেন্স, স্কুটার ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে। এদের সমিতিও আছে। সমিতিকে নগদ টাকা না দিয়ে এখান থেকে কোনো রোগী বা মৃতদেহ কেউ নিতে পারে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দিন-রাত সবসময় দাঁড়িয়ে থাকে অ্যাম্বুলেন্স। ৩০ থেকে ৪০টি অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রী ঠিক করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে ২০-২৫ দালাল। রোগী নিয়ে শুরু হয় টানাটানি।

এই বিষয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের পরিচালনা কমিটির এক নেতা জানান, জায়গার দূরত্ব অনুযায়ী টাকা নেওয়া হয়, তবে ঢাকার ভেতরে যত কাছেই হোক দুই হাজার টাকার কমে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেওয়া হয় না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের অভাব রয়েছে। ৯টি হাসপাতালে রয়েছে ৩৩টি অ্যাম্বুলেন্স। একমাত্র হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রয়েছে ১৫টি অ্যাম্বুলেন্স। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রয়েছে সাতটি অ্যাম্বুলেন্স। রোগীরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবসময় বলে, বিনা টাকায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা যাবে; কিন্তু চালকরা মোটা টাকা নেয়।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্র ফিটনেসবিহীন অথবা অকেজো গাড়ি কোনোমতে মেরামত করে অ্যাম্বুলেন্স লিখে লাগিয়ে দেয় ব্যবসায়। অ্যাম্বুলেন্স লেখা থাকলে পুলিশ ধরে না। আর এসব অ্যাম্বুলেন্স রোগী বহনের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মাঝপথে বিকল হয়ে পড়লে রোগী ও তার অভিভাবকদের পড়তে হয় বিপাকে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এ ব্যবসায় জড়িত।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ নেওয়ার সময় ওই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার না করলে মর্গ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। আবার ভাড়ার ক্ষেত্রেও গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। মাত্র ২০ কিলোমিটার অ্যাম্বুলেন্সে যেতে একজন রোগীর জন্য গুনতে হয় পাঁচ হাজার টাকা।

বিভিন্ন গ্যারেজ সূত্রে জানা গেছে, অব্যবহৃত মাইক্রোবাসগুলোই মেরামত করে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের পরিবর্তনের সময় সবার আগে অ্যাম্বুলেন্সে সাইরেন হর্ন লাগানো হয়। কারণ রাস্তায় পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্সকে মানবিক কারণে ছেড়ে দেয়, ভেতরে কী রয়েছে তা দেখে না।

তার ভাষ্য.  এসব অ্যাম্বুলেন্সের নেই ফিটনেস সার্টিফিকেট, নেই রুট পারমিটের স্টিকার, অক্সিজেন, ফাস্ট এইড বক্স। এ ছাড়া স্যালাইন, প্রেসার মাপার যন্ত্র, অ্যান্টিসেপটিক, গজ, ব্যান্ডেজ ও লাইফ সেভিং ওষুধ রাখা অত্যাবশ্যকীয় হলেও সেগুলোর কিছুই নেই এসব অ্যাম্বুলেন্সে।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী