টেস্টের পোশাকে শহীদ আফ্রিদি। ছবি: সংগৃহীত

আমির-আসিফদের ফিক্সিং নিয়ে আফ্রিদির আত্মজীবনীতে বিস্ফোরক তথ্য

আত্মজীবনীতে নিজের আসল বয়স জানিয়েছেন আফ্রিদি। এবার আরও চমকপ্রদ তথ্য জানা গেল আফ্রিদির আত্মজীবনী থেকে।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৪ আপডেট: ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৪
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৪ আপডেট: ০৪ মে ২০১৯, ১৮:১৪


টেস্টের পোশাকে শহীদ আফ্রিদি। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ‘গেম চেঞ্জার’- গত কয়েকদিনে নামটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছেন ক্রিকেটেরমোদীরা। এটা পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির আত্মজীবনী। বুমবুম খ্যাত আফ্রিদি এই বইটি দিয়ে রীতিমতো বোমা ফাটিয়েছেন। অনেক অজানা তথ্যই জায়গা পেয়েছে এই বইয়ের পাতায়।

আত্মজীবনীতে নিজের আসল বয়স জানিয়েছেন আফ্রিদি। কড়া সমালোচনা করেছেন ওয়াকার ইউনুস ও ভারতের সাবেক ওপেনার গৌতম গম্ভীরের। এবার আরও বড় তথ্য জানা গেল আফ্রিদির আত্মজীবনী থেকে। ২০১০ সালে লর্ডস টেস্টে সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ, মোহাম্মদ আমিরদের করা স্পট ফিক্সিং নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য আছে গেম চেঞ্জার বইটিতে।

ওই সিরিজে নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল আফ্রিদিরই। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় এশিয়া কাপ ও উইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলে ইংল্যান্ড সফরে যাওয়া আফ্রিদি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলেই সাদা পোশাকের নেতৃত্ব ছেড়ে দেন। পাকিস্তানের ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই স্পট ফিক্সিং নিয়ে আত্মজীবনীতে লেখা আফ্রিদির বক্তব্য তুলে ধরা হলো-

এমন দুর্নীতি করা সেই চক্রের সত্যিকারের প্রমাণ আমি পেয়েছিলাম। ফোনের ম্যাসেজগুলো ছিল স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়া খেলোয়াড়দের বিপক্ষে। প্রমাণগুলো আমি টিম ম্যানেজমেন্টকে দেখাই। পরের ঘটনা খুব একটা আশানুরূপ ছিল না। যে কারণে পাকিস্তান দল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের ওপর আস্থা বাড়েনি।

শ্রীলঙ্কায় একটি সফরে গিয়েছিলাম। সেখানে মাজহার মাজিদের (সালমান বাটের এজেন্ট ও ম্যানেজার) একটি ম্যাসেজ আমার হাতে আসে। ম্যাসেজটি হাতে পাওয়া ছিল একেবারেই কাকতালীয় ব্যাপার। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল একটি শিশু, ফোন মেরামতকারী ও সমুদ্র সৈকত।

শ্রীলঙ্কা সফরের আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালীন ক্রিকেট দলের সঙ্গে যোগ দেয় মাজিদের পরিবার। শ্রীলঙ্কার এক সৈকতে মাজিদের বাচ্চা ছেলেটি তার বাবার ফোন পানিতে ফেলে দেয়। ফোনটি নষ্ট হয়ে যায়। মাজিদ ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় ফোনটি নিয়ে যায় এবং একটি দোকানে ঠিক করতে দেয়। দোকানে ফোনটি বেশ কিছুদিন ছিল। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, সেই দোকানের মালিক আমার এক বন্ধুর বন্ধু (বিষয়টি একটু বেশি কাকতালীয় মনে হলেও ইংল্যান্ডে পাকিস্তানি জনগোষ্ঠী একে-অপরের বেশ ঘনিষ্ঠ)।

ম্যাসেজগুলো পুনরুদ্ধার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল দোকানের মালিককে। ফোন মেরামতের সময় পাকিস্তানের খেলোয়াড়দেরকে মাজিদের পাঠানো ম্যাসেজগুলো দোকানদারের নজরে আসে। যদিও এ কাজটি করা তার উচিত হয়নি। যাই হোক, সে ম্যাসেজগুলো সেই বন্ধুসহ আরও কয়েকজনের (নাম আমি বলব না) কাছে ফাঁস করে দেয়। আর এভাবে আমিও জেনে যাই।

তখন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, পাকিস্তান ক্রিকেট দলে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটছে। ম্যাসেজ ফাঁস হওয়াতে অনুসন্ধানী চোখ রাখে ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর প্রতিবেদক দল। শ্রীলঙ্কায় নষ্ট হওয়া ফোন লন্ডনে এক পাকিস্তানি মেরামতকারী দেখে মুখ বন্ধ রাখতে পারেনি। তবে আমি এতটুকু অবাক হইনি। সৃষ্টিকর্তা বরাবরই ভীষণ অপ্রত্যাশিত পথে সুবিচার করে থাকেন।

ম্যাসেজগুলো পাওয়ার পর কোচ ওয়াকার ইউনুসকে আমি দেখাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে এ বিষয়টি উচ্চমহলকে জানায়নি। ওয়াকার ও আমি দুজনই ভেবেছিলাম, এটা তেমন কোনো বিষয় নয়। মনে হচ্ছিল দেখে যত ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, আসলে ততটা না। মাজিদ ও খেলোয়াড়দের মধ্যে চালাকিপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছে বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু ম্যাসেজগুলো অনেক বড় কিছুর অংশ ছিল, যা পরে গোটা বিশ্ব জানতে পারে।

ওই বছর উইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালীন আবদুর রাজ্জাক জোরের সঙ্গে আমাকে বলেছিল, সালমান, আমির ও আসিফ ‘ভালো কিছু করছে না’। আমি তার কথা গুরুত্ব দিইনি। এসব রাজ্জাকের কল্পনা বলে মনে মনে ভেবেছি। ভেবেছি তাদের সন্দেহজনক আচরণ তারুণ্য ও অনভিজ্ঞতার প্রতিফলন। লন্ডন থেকে যে ম্যাসেজগুলো পেয়েছিলাম, সে সম্পর্কে রাজ্জাককে আমি কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম রাজ্জাকের মতো খেলোয়াড়, যে কি না ড্রেসিং রুমের রাজনীতি থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রাখে; তারও তো একই মত যে, সালমান এবং কয়েকজনের মধ্যে কোনো গড়বড় আছে।

২০১০ সালে ইংল্যান্ডে সেই কলঙ্কজনক সফরের আগে মাজহার এবং তার সঙ্গীদের আবারও দলের আশপাশে দেখি। তখন মনে হয়েছিল আর চুপ থাকা যায় না। সিদ্ধান্ত নিই বিষয়টি অফিশিয়ালি টিম ম্যানেজার ইয়ার সাঈদকে জানাব। মাজহারকে দলের কাছ থেকে দূরে থাকার এবং কোনো খেলোয়াড় যেন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ না করে, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাই। নিজের মান-সম্মান নিয়েও ভীত ছিলাম। যেহেতু তখন আমি টি টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক, কোনো বিতর্ক দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে এই ভয়টা ছিল।

সাঈদ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ম্যাসেজগুলো কাগজে প্রিন্ট করেও তাকে দেখিয়েছি। কিন্তু তার কোনো পদক্ষেপ ছিল না, বরং অদ্ভুত জবাব দেয়, ‘এ নিয়ে আমরা কী করতে পারি? তেমন কিছুই না।’ দলের সিনিয়র অফিশিয়ালের কাছ থেকে এমন কথা শুনব, তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তেমন কিছুই না? দল, দেশ ও লাখো ভক্তদের নিয়ে আমরা এসব কীভাবে করতে পারি! সাঈদ যা বলেছিল, তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চাইনি।

হতাশ হয়েছিলাম। খুব বেশি প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু প্রিন্টগুলো নিজের কাছে রেখেছি। এমনকি, সাঈদ আমার কাছে সেগুলোর কোনো প্রতিলিপিও চায়নি। পরের দিন নর্দাম্পটনে প্রস্তুতি ম্যাচের সময় মাজহার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা আবারও ড্রেসিং রুমের আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছিল। ইয়ার সাঈদকে গিয়ে তাই আবারও বলি, এসব লোকজনের দলের আশপাশে থাকা উচিত নয়। কারণ ওদের সম্পর্কে ভালো কোনো কথা কখনো শুনিনি।

মাজহার ও খেলোয়াড়দের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া ম্যাসেজ অনেকের কাছেই ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা জানত কিছু একটা ঘটেছে। সম্ভবত ঠিক এ সময়েই ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ স্টিং অপারেশন চালায়। আরেকজনের ম্যাসেজ নিয়ে আমি পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্টকে জোর দিয়ে সেভাবে কিছু বলিনি। তবে সালমান, আমির ও আসিফের বিপক্ষে গোপনভাবে তদন্ত চালানো যায় এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্ট বারবার তা নাকচ করে দিয়েছে। তাদের যুক্তি, এ নিয়ে তেমন কিছুই করার নেই।

সত্যি বলতে, আমি মনে করি টিম ম্যানেজমেন্ট বিষয়টি পাত্তাই দেয়নি। এটা যেন কারও কোনো সমস্যা না! ম্যানেজমেন্ট সম্ভবত এর পরিণতি নিয়ে ভীত ছিল। কিংবা এসব খেলোয়াড়ের পেছনে বিনিয়োগ করে তারা ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে ভেবেছে। কিংবা নিজেদের দেশ ও খেলাটির প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। আমি ঠিক বলতে পারব না।

ইংল্যান্ডে আসার পর খেলোয়াড়দের বলেছি মাজহার এবং তার অনুসারীদের কাছ থেকে দূরে থাকতে। কোচ ও ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো কিছুই বদলায়নি। লর্ডসে প্রথম টেস্টে ভেবেছি, পাকিস্তান ক্রিকেটের কী সমস্যা? সবাই এমন করছে কেন? ঠিক তখনই নিজের মতো করে ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিই। ম্যাচ চলাকালীন চতুর্থ দিনে সালমানকে বলি, এখন থেকে তুমি দায়িত্ব নিতে পারো।

হ্যাঁ, ওভাবে দল ছাড়া আমার উচিত হয়নি। বাড়ি না ফিরে দ্বিতীয় টেস্ট খেলা উচিত ছিল। হ্যাঁ, আমি সমস্যায় ছিলাম। কিন্তু দায়িত্বটা আমার কাঁধে ছিল বলে আরও অনেক কিছু করা উচিত ছিল আমার। কিন্তু টেস্ট থেকে অবসর নিলাম, সম্ভবত অকালেই। দল-টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। সবার ওপর থেকে তো বটেই, নিজের ওপরেও ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলাম। এ কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পুরো টেস্ট সিরিজ না খেলে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিই।

হ্যাঁ, এসব দেখেই আমি হাল ছেড়েছি। থেমে গেছি।