রিফাত শরীফকে বরগুনা কলেজ গেট থেকে ঝাঁপটে ধরে নিচ্ছে যাচ্ছে খুনিরা। ছবি: সংগৃহীত

রিফাত হত্যা: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কে নেতৃত্বে ছিল?

এই ফুটেজে রিফাতকে কিভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, কে ধরে, রাম দা দিয়ে কে কোপ শুরু করে তার সবকিছুই মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:৫১ আপডেট: ০৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:৫১
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:৫১ আপডেট: ০৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:৫১


রিফাত শরীফকে বরগুনা কলেজ গেট থেকে ঝাঁপটে ধরে নিচ্ছে যাচ্ছে খুনিরা। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফকে কোথায়, কখন কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল তার একটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। এই ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের চিত্র। কয়জন কিভাবে হত্যার মিশন শুরু করে সেটিও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে ফুটেজটি দেখে। এই ফুটেজে রিফাতকে কিভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, কে ধরে এবং রাম দা দিয়ে কোপ শুরুর সবকিছুই দেখা যাচ্ছে। (অধিকমাত্রায় নৃশংস হওয়ায় ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়নি)।  

গত ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফ সাদা রঙের মোটরবাইকে করে বরগুনা সরকারি কলেজের গেটের সামনে আসেন। এরপর তিনি কলেজের ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে প্রবেশের কিছু সময় পর ঘটনাস্থলে আসেন রিফাত ফরাজী। আরও দুই থেকে তিন মিনিট পর রিফাত ফরাজীর দু-তিন সঙ্গী কলেজে ঢুকে। রিফাত শরীফ ও তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি কলেজ থেকে বের হন। রিফাত ফরাজীর সঙ্গে দলবলকে দূর থেকে দেখে স্বামীকে টেনে ধরে ফের কলেজে ঢোকানোর চেষ্টা করেন মিন্নি। কিন্তু পারেননি। টেনেহিঁচড়ে রিফাতকে বের করে এনেই প্রথমে কিল ঘুষি। এরপরেই রাম দায়ের কোপ। রিফাতকে এলোপাতারি কোপাতে থাকেন নয়ন বন্ড ও অন্যরা। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার নতুন একটি ভিডিও ফুটেজে স্ত্রীর সামনেই রিফাত হত্যাকাণ্ডের এই বিবরণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি রামদা ৮ জুলাই, সোমবার সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। 

ফুটেজে রিফাত ফরাজীকে কালো জামা ও চোখে কালো চশমা পরা অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় তার ছয়-সাতজন সঙ্গী কলেজ গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ ছিল। কিছুক্ষণ পর রিফাত ফরাজীর দু-তিনজন সঙ্গী কলেজের ভেতরে যায়। হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে রিফাত ফরাজী কলেজ গেটের সামনের রাস্তার উত্তর পাশে অবস্থান নেন।

রিফাতকে কোপানোর দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

পরে রিফাত শরীফ তার স্ত্রীকে নিয়ে কলেজ গেট থেকে বের হন। তারা মোটরসাইকেলে উঠে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি রিফাত ফরাজী ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের দেখে স্বামীকে ভেতরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেতরে পৌঁছানোর আগেই রিফাত ফরাজীর নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন রিফাত শরীফকে ধরে ফেলে। কিল, ঘুষি দিতে দিতে ফটকের সামনের সড়ক থেকে পূর্ব দিকে নিয়ে যায়। সেখানেই প্রথম দেখা যায় নয়ন বন্ড ও অন্যদের।

নয়ন বন্ডের কাছে রিফাত শরীফকে নিয়ে যাওয়ার পর ১০-১২ জন তাকে ঘিরে ধরে পেটাতে শুরু করে। এ সময় রিফাত ফরাজী ও তার অপর এক সহযোগী দৌড়ে কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে রাখা দুটি রামদা নিয়ে আসেন। এর একটি রামদা নয়নের হাতে দেয় রিফাত ফরাজী। এরপর রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ড দুজনে মিলে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন রিফাত শরীফকে। আর তাদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন স্ত্রী মিন্নি।

রিফাতকে  যে রাম দা দিয়ে কোপানো হয়। ছবি: সংগৃহীত

নতুন ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ড রামদা হাতে সবার সামনে দিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে ঘটনাস্থলের পশ্চিম দিকে চলে যান। তখন রিফাত শরীফের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সমস্ত পথ।পরে ওইদিন বিকেল ৩টার দিকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেলে মারা যান রিফাত শরীফ।

ভিডিওটি দেখে মনে হয়েছে রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড ছিল সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত। কেউ কিছু আঁচ করার আগেই তারা এই হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন।

নতুন ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাত শরীফকে কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে থেকে ধরে আনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বন্ড-০০৭–এর সদস্যদের ঘটনাস্থলে জড়ো করা, কোপানোর জন্য লুকিয়ে রাখা রামদা আনা সব করেন রিফাত ফরাজী। রিফাত ফরাজী বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। 

রিফাত হত্যার ঘটনায় মামলা:

ঘটনার পরের দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে এজারহারভুক্ত আসামি করে এবং ৪-৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে গত শনিবার জবানবন্দি দিয়েছেন সাগর ও নাজমুল ইসলাম। এর আগে চন্দন, মো. হাসান, অলিউল্লাহ ও তানভীর হাসান জবানবন্দি দিয়েছেন। এই চারজনের মধ্যে প্রথম তিনজন এজাহারভুক্ত আসামি। এ ছাড়া মামলার আসামি নয়ন বন্ড গ্রেফতারের পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। রিফাত ফরাজী এ মামলায় ২নং আসামি। 

রিফাতকে হত্যায় মেসেজ আদান-প্রদান হয় যে মাধ্যমে:

পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা রিফাত শরীফকে কোপানোর সময় সেখানে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ফেসবুকের মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘বন্ড ০০৭ ’-এ বার্তা পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন। হত্যা পরিকল্পনা সম্পর্কে গ্রুপে আগাম কোনো আলোচনা হয়নি। তাই তারা জানতেন না হত্যা করা হবে। এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী এবং রিফাতের ছোট ভাই রিশান ফরাজী। তাদের মধ্যে রিশান এখনো গ্রেফতার হননি।

এক কর্মকর্তা জানান, অলিউল্লাহ, তানভীরসহ অন্যরা জবানবন্দিতে বলেছেন, এই হামলায় বন্ড ০০৭ গ্রুপের অন্তত ২০ জন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। হামলার সময় পথচারী বা রিফাত শরীফের দলের কেউ যেন এগিয়ে আসতে না পারে, তা সামলানোর দায়িত্ব ছিল একটি দলের। হামলার পর সবাই যেন বিনা বাধায় পালাতে পারে তা নিশ্চিতে পাহারায় ছিল আরেকটি প্রুপ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের জানান, এসব বিষয় নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। রিফাত ফরাজী এরই মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এ ঘটনায় নতুন ভিডিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। রিফাত হত্যার মিশন পরিচালনা করা হয়েছে ০০৭ নামের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে। এই গ্রুপটির নামকরণ করা হয়েছিল জেমস বন্ডের ০০৭ নামের সঙ্গে মিল রেখে। গ্রুপের প্রধান নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজী ছিল সেকেন্ড ইন কমান্ড।

হত্যার আগের রাতে এই গ্রুপে হামলার নির্দেশনা দিয়ে সদস্যদের রামদা নিয়ে আসতে বলে রিফাত ফরাজী। নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এ তথ্য জানা গেছে।

ঘটনার ৭ দিন আগে থেকে শুরু হয় রিফাত শরীফের ওপর হামলার পরিকল্পনা। কয়েক দফায় হওয়া এই পরিকল্পনা বৈঠকে খুনি নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী এবং রিশান ফরাজী ছাড়াও অংশ নেয় নয়ন-রিফাত বাহিনীর অন্য সদস্যরা। এসব বৈঠকে ছক সাজিয়ে পরিকল্পনা হয় রিফাতকে হত্যার। সবশেষ বৈঠক হয় ২৫ জুন মঙ্গলবার রাতে। এ ছাড়া মেসেঞ্জার গ্রুপ ০০৭-এ হত্যার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রিফাত মেসেঞ্জারে একটি রামদার ছবি দিয়ে অন্যদের বলে- পারলে সঙ্গে করে এটা নিয়ে আসিস। মূলত এটাই ছিল রিফাত শরীফকে হত্যার সর্বশেষ পরিকল্পনা।

নয়ন বন্ডরা একদিনে তৈরি হয়নি: হাইকোর্ট

রিফাত হত্যার আসামি নয়ন বন্ড ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার পরদিন ৪ জুলাই হাইকোর্ট মন্তব্য করে যে, নয়ন বন্ড একদিনে তৈরি হয়নি, তাকে তৈরি করা হয়েছে। রিফাত হত্যাকাণ্ড ও নয়ন বন্ড তৈরির নেপথ্যে কারা রয়েছে তা খতিয়ে দেখার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার অগ্রগতি বিষয়ে ৪ জুলাই সকালে বরগুনা জেলার ডিসি ও এসপির প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন হাতে পেয়ে এমন মন্তব্য করে হাইকোর্ট।

রিফাতকে হত্যায় ব্যবহৃত রামদা উদ্ধার

রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যায় ব্যবহৃত একটি রামদা উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার সরকারি কলেজ ক্যান্টিনের পূর্ব পাশের ডোবা থেকে রামদাটি উদ্ধার করা হয়। এই রামদাটি দিয়েই রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কোপানো হয় বলে নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির। সকালে রিফাত ফরাজীকে সঙ্গে নিয়ে তার দেখানো ডোবা থেকে রামদাটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান হুমায়ুন কবির।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল