ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ফাইল ছবি

ওসি মোয়াজ্জেমের ‘আইনজীবীর আচরণে’ ক্ষুব্ধ বিচারক

বিচারক ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবীকে বলেন, ‘মামলা বিলম্ব করার চেষ্টা করবেন না।’

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৯, ২০:৫২ আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, ২১:২২
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৯, ২০:৫২ আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, ২১:২২


ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীর বক্তব্য ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা মামলার আসামি ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবীর কর্মকাণ্ডে ‘ক্ষুব্ধ’ হয়েছেন বিচারক আস শামস জগলুল হোসেন।

১০ জুলাই, বুধবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের এজলাসে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

বামে নিহত নুসরাত জাহান রাফী ও ডানে ওসি মোয়াজ্জেম। ফাইল ছবি 

যে কারণে ক্ষুব্ধ হলেন বিচারক

গত ৩০ জুন মোয়াজ্জেমের পক্ষে আইনজীবী ফারুক আহমেদ মামলায় জব্দকৃত আলামত ওসি মোয়াজ্জেমের ধারণ করা ভিডিও চিত্রের কপি সরবরাহের জন্য আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। গতকাল ৯ জুলাই আইনজীবী ফারুক হোসেন ট্রাইব্যুনাল থেকে যেন পেনড্রাইভে ওই ভিডিওর কপি দ্রুত পান সেজন্য তাগিদ দেওয়ার আবেদন জানান। এ সময় বিচারক ক্ষুব্ধ হন। বিচারক প্রশ্ন করেন, পেনড্রাইভ আপনাকে দিতে আদেশ হয়েছে কবে? উত্তরে আইনজীবী, বলেন গত ৩০ জুন।

বিচারক আবার প্রশ্ন করেন, ‘নকলখানা থেকে এটা নেওয়ার জন্য আপনি দরখাস্ত করেছেন কবে?’ আইনজীবী উত্তরে বলেন, ‘৭ জুলাই।’ বিচারক রেগে গিয়ে বলেন, ‘সাত দিন পর দরখাস্ত দিলেন কেন? বিচার বিলম্বিত করতে?’ বিচারক বলেন, ‘আজ আসামিকে বিশেষ কারণে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। আসামি এলে আপনি আবার সময়ের আবেদন করে বলতেন, পেনড্রাইভের কপি পাননি এই অজুহাতে।’

আইনজীবী বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না, কীভাবে নকল পাবো?’ বিচারক বলেন, ‘আপনার বোঝার দরকার নেই। আপনি একটা সিডি বা পেনড্রাইভ জমা দেবেন। নকল কিভাবে সরবরাহ করা হবে তা নকলখানা বুঝবে।’ পরে বিচারক মোয়াজ্জেমের আইনজীবীকে বলেন, ‘মামলা বিলম্ব করার চেষ্টা করবেন না।’

মামলার শুনানি করতে নতুন তারিখ নির্ধারণ

মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা এ মামলায় অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানি আবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ ওসি মোয়াজ্জেমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির না করায় বিচারক আস শামস জগলুল হোসেন অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে ১৭ জুলাই দিন ধার্য করেন।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আসামিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে হাজির না করায় শুনানি হয়নি। গত ৩০ জুন শুনানির তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু আসামি পক্ষ থেকে সময় চাওয়ায় তারিখ পরিবর্তন করা হয়।

গ্রেফতারের পর আদালতে নেওয়া হচ্ছে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে। ফাইল ছবি

ওসির বিরুদ্ধে কেন মামলা?

নুসরাত জাহান রাফীকে ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসার অধ্যাক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা কর্তৃক যৌন নির্যাতনের বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন এক আইনজীবী।

গত ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এই মামলা দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনাল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় মামলাটি করা হয়।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই সদর দপ্তরের সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা তদন্ত প্রতিবেদনে দাখিল করে বলেন, ‘রাফিকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর তাকে থানায় জেরা করার দৃশ্য নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা প্রচার করেন ওসি মোয়াজ্জেম। ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে ওসি মোয়াজ্জেম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।’

যেভাবে গ্রেফতার হন ওসি মোয়াজ্জেম

সাইবার ট্রাইব্যুনালের এ মামলায় গত ১৬ জুন হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে আসেন ওসি মোয়াজ্জেম। কিন্তু নির্ধারিত দিনে জামিন আবেদন শুনানি না হওয়ায় হাইকোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার হন তিনি। শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরদিন ফেনীর সোনাগাজী থানা পুলিশের কাছে তাকে সোপর্দ করা হয়। সোনাগাজী থানা পুলিশ এই আসামিকে ১৭ জুন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করান। ওইদিন মোয়াজ্জেমের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলে ওই আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ মে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল। আগের দিন পিবিআই মোয়াজ্জেমের অপরাধ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

যেভাবে নিহত হন নুসরাত জাহান রাফী

গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতর নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। নুসরাত ওই মাদরাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা।

পরিবারের দাবি, মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন নুসরাত।

পরে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয় তাকে। এরপর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। কিন্তু তারপরও তাকে বাঁচানো যায়নি। 

প্রিয় সংবাদ/রুহুল