বিদেশে অবস্থানরত সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। ফাইল ছবি

১ বছর ১০ মাস ১ দিন পর সিনহার বিরুদ্ধে মামলা

সিনহার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে কি আছে?

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৯, ২২:৪১ আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, ২২:৪১
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৯, ২২:৪১ আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, ২২:৪১


বিদেশে অবস্থানরত সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ মোট ১১জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

১০ জুলাই, বুধবার মামলাটি করা হয়েছে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ২০১৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দেশ ত্যাগ করেছেন। সে হিসাবে ১ বছর ১০ মাস ১ দিন বিদেশে অবস্থানরত সাবেক এই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলা হলো।

সিনহার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে কি আছে?

ভুয়া ঋণের মাধ্যমে চার কোটি টাকা স্থানান্তর ও আত্মসাৎ করার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলার এজাহারে। দুদকের দায়ের করা ওই মামলায় বিচারপতি এস কে সিনহা ও ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সাবেক এমডি এ কে এম শামীমসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আসামিরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে চার কোটি টাকা ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে তা একই দিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে আসামি এস কে সিনহার ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি একাউন্ট খোলেন। পরের দিন ৭ নভেম্বর তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য দুই কোটি টাকা করে চার কোটি টাকার ঋণ আবেদন করেন। তাদের ব্যাংক একাউন্ট ও ঋণ আবেদনে এস কে সিনহার উত্তরার (১০ নম্বর সেক্টর, রোড নং-১২, বাড়ি -৫১) ঠিকানা ব্যবহার করেন তারা। এ ছাড়া ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয়। এই দম্পতি এস কে সিনহার আগে থেকেই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ।

ঋণ প্রস্তাব কোনো যাচাই-বাছাই না করে ব্যাংকের নিয়ম-নীতি না মেনে ব্যাংকটির সেসময়ের এমডি আসামি এ কে এম শামীম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুইটি ঋণ অনুমোদন করেন। ঋণ আবেদনের পরের দিন ৮ নভেম্বর পৃথক দুইটি পে-অর্ডার এস কে সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। যা পরের দিন ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার একাউন্টে জমা হয়। পরে বিভিন্ন সময় ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা উঠানো হয়।

এর মধ্যে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যাংক হিসাবে একই বছরের ২৮ নভেম্বর দুইটি চেকে দুই কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামি রনজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রভাব দেখিয়েছেন। রনজিৎ চন্দ্রের ভাতিজা হলেন ঋণ গ্রহীতা নিরঞ্জন এবং অপর ঋণ গ্রহিতা শাহজাহান রনজিৎ চন্দ্রের ছোট বেলার বন্ধু। ঋণ গ্রহীতা দুইজনই অত্যান্ত গরীব ও দুঃস্থ। তারা কখনও ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি। আসামি এস কে সিনহা অপর আসামি রনজিতের মাধ্যমে অন্যান্য আসামিদের ভুল বুঝিয়ে কাগজপত্র স্বাক্ষর করার ব্যবস্থা করেন। উক্ত ঋণের চার কোটি টাকা আজও পরিশোধ করা হয়নি।

অর্থের উৎস এবং অবস্থান গোপন করে পাচারের প্রচেষ্টা করার দায়ে দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) এবং মানিল্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২), (৩) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

মামলায় আসামি করা হয় যাদের

বিচারপতি এস কে সিনহা বাদে অপর আসামিরা হলেন, ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জিয়া উদ্দিন আহমেদ, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান, একই এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, রনজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায়।

এসকে সিনহার ব্যাংক লেনদেনে জালিয়াতি নিয়ে দুদকের চেয়ারম্যান

এর আগে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ব্যাংক হিসাবে চার কোটি টাকা লেনদনের ঘটনায় জালিয়াতির প্রমাণের কথা জানিয়েছিলেন দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। ফাইল ছবি

সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তার অনুসন্ধান

অভিযোগ অনুসন্ধানে ওই বছরের ৬ মে ও ২৬ সেপ্টেম্বর মোট আট জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ সেপ্টেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি কে এম শামীমসহ ছয় কর্মকর্তা এবং ৬ মে মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে চার কোটি টাকা স্থানান্তরের বিষয়টি স্বীকার করেন।

এসকে সিনহাকে নিয়ে সে সময় যা বলেছিলেন আইনমন্ত্রী

২৩ সেপ্টম্বর রবিবার নারায়ণগঞ্জে জেলা আইনজীবী সমিতির এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দুদক খতিয়ে দেখছে। দুদক তার বিরুদ্ধে যখন মামলা করবে, তখনই মামলা হবে। সরকার এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ফাইল ছবি

দেশ ছেড়ে যাওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার আত্মজীবনীমূলক বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’। ওই বইতে তিনি দাবি করেছেন, প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তকর্তার হুমকির মুখে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠাতে বাধ্য হন।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়ার রায় এবং সেই রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের তীব্র সমালোচনার ‍মুখে ছিলেন এস কে সিনহা। গত বছরের ১৩ অক্টোবর ছুটিতে থাকা অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি।

সেদিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বিবৃতিতে সিনহা বলেছিলেন, তিনি অসুস্থ নন, সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। চাপে নয়, ছুটি কাটাতে স্বেচ্ছায় বিদেশে যাচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন, আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আমি আবারো ফিরে আসবো।

তবে তিনি আর ফিরে আসেননি। ছুটিতে থাকার মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। বিদেশ থেকে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল