ঢাকা ওয়াসা। ফাইল ছবি

‘বিশুদ্ধ পানি চাই’

নোটিশের পাশপাশি আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তাদের। কিন্তু এখনো বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ওয়াসা।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:২৮ আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:২৮
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:২৮ আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:২৮


ঢাকা ওয়াসা। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) জীবনের অপর নাম পানি। শুধু পানি বললে ভুল হবে, বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন। রাজধানী ঢাকায় কোটি মানুষের বসবাস। তাদের জীবন বাঁচাতে বিশুদ্ধ পানির বিকল্প নেই।

বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ঢাকা ওয়াসা। পানি সরবরাহ করলেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ‘ব্যর্থতার’ পরিচয় পাওয়া গেছে। কারণ ইতোমধ্যে ওয়াসার বিভিন্ন জোনের পানি পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে মানবজীবনের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। এমনকি মলের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে এই পানিতে। নানাবিধ সমস্যা ও ময়লা পানির প্রতিবাদ জানিয়ে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন ঢাকাবাসী। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।

শেষ পর্যন্ত রিট করতে হয়েছে উচ্চ আদালতে। কারণ দর্শানোর নোটিশের পাশপাশি আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তাদের। কিন্তু এখনো বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেন তানভীর আহম্মেদ নামের একজন আইনজীবী।  

ওয়াসার পানি নিয়ে হাইকোর্টে রিট

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ফাইল ছবি

২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর ‘অনিরাপদ পানি পান করছে সাড়ে সাত কোটি মানুষ’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন ছাপা হয়। গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন যুক্ত করে সে বছরের ১৪ অক্টোবর রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ।

ওয়াসার পানি পরীক্ষা করতে কমিটি গঠনের নির্দেশ

হাইকোর্টে রিট আবেদনের পর ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর রুল জারি করে আদালত। ওয়াসার পানির মান পরীক্ষায় চার সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলা হয়। এরপর গত ১৮ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে ওয়াসার পানি পরীক্ষা করতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি তিন দফা সুপারিশ করে। সুপারিশে বলা হয়, নিরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া সরবরাহকৃত এলাকায় ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণরোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সমস্যাপ্রবণ এলাকায় সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিবারে বা খানায় পানির মান সার্বিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সব পরিবারে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের শুনানিতে যা বলল আদালত

হাইকোর্ট বলেছে, ‘তারা (ওয়াসা) সমস্যার সমাধান করতে পারলে ভালো। আমাদের দরকার পানি, বিশুদ্ধ পানি। যদি ওয়াসা তা নিশ্চিত করতে পারে, তা ভালো।’

২৪ জুলাই, বুধবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন।

ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন জোন থেকে সংগৃহীত পানির আট নমুনায় ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণ বিষয়ে ওয়াসার বক্তব্য দাখিলের জন্য সময় চাওয়া হলে আদালত আইনজীবীদের উদ্দেশে এ কথা বলেন।

এর আগে আদালতের আদেশ অনুসারে গঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট কমিটি বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআরবির পরীক্ষাগারে পানির নমুনা পরীক্ষা করে এক প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনটি ৭ জুলাই আদালতে দাখিল করা হয়।

তদন্ত কমিটি কি প্রতিবেদন দিয়েছিল

উৎসসহ ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন জোন থেকে সংগৃহীত পানির ৩৪টি নমুনার মধ্যে আটটিতে ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণ পাওয়া গেছে। এই দূষণ রোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলেও কমিটির সুপারিশে বলা হয়। সেদিন শুনানি নিয়ে আদালত এই প্রতিবেদনের বিষয়ে হলফনামা আকারে বক্তব্য ওয়াসাকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ২৪ জুলাই বুধবার আদেশের জন্য দিন রাখেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ বিষয়টি আদালতের কার্যতালিকায় আসে।

শুনানিতে আইনজীবীরা যা বললেন

শুনানির শুরুতেই ওয়াসার আইনজীবী এ এম মাছুম বলেন, ‘আইসিডিডিআরবি ও বুয়েটে ওয়াসার পানি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। চার সদস্যের কমিটির প্রতিবেদনে মিরপুর ও পাতলা খান লেনে ফিকেল কলিফর্ম পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ইতিমধ্যে পাতলা খান লেনের পরীক্ষার প্রতিবেদন এসেছে। তবে মিরপুরেরটা রোববার পাব। এ ছাড়া ওই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’ তিনি সময়ের আরজি জানান।

প্রতিউত্তরে রিট আবেদনকারী আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আদালতের আদেশের তিন মাস পর কমিটি গঠন হয়েছে। আজ কমিটির রিপোর্টের ওপর জবাব দেওয়ার কথা ছিল। এখন তারা সময় চাইছে।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘তারা (ওয়াসা) সমস্যার সমাধান করতে পারলে ভালো। আমাদের দরকার পানি, বিশুদ্ধ পানি। যদি তারা তা নিশ্চিত করতে পারে, তা ভালো।’ আদালত আগামী মঙ্গলবার শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন।

ওয়াসার পানি নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদন

গত ১৭ এপ্রিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানায়, ঢাকা ওয়াসার পানি নিম্নমানের। এ কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন। তবে টিআইবির এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান বলেন, ‘ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়।’ তাঁর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন রাজধানীর কয়েক এলাকার বাসিন্দারা।

 ওয়াসার পানি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন

জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মিজানুর রহমানসহ অন্যরা ওয়াসা ভবনের সামনে অবস্থান করেন। 

ঢাকার জুরাইন নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের সমন্বয়ক মিজানুর রহমান ওয়াসার এমডির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দায়িত্বশীল পদে থেকে একজন এ রকম কথা কীভাবে বলেন!’ তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াসার এমডিকে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে।’ এ ছাড়া পানির জন্য এত দিন যে বিল দিয়ে এসেছেন, তা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তিনি। বিশুদ্ধ পানি না দেওয়া পর্যন্ত তারা পানির বিল দেবেন না।

পূর্ব রামপুরা থেকে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচ বছরের কোনো শিশুও তো বলবে না যে ওয়াসার পানি ভালো। পানির ট্যাংকে যদি ময়লা জমে, তা তো গায়েবি ময়লা না। ওয়াসার নোংরা পানি থেকেই সে ময়লা জমে।’

মিজানুর রহমান জানান, তারা পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা। সেখানে ৩৫ বছর আগে ওয়াসার লাইন বসানো হয়। শুরুর ১০ বছর পানি ভালো ছিল। এরপর পানি নোংরা হতে শুরু করে। এখন সেই পানি ফুটিয়েও খাওয়ার অবস্থা নেই। ড্রেনের পানির মতো নোংরা পানি আসে। নানাভাবে ওয়াসাকে জানানো হয়। ২০১২ সালে বর্তমান এমডি বরাবর সাড়ে তিন হাজার স্বাক্ষর নিয়ে আবেদনও করা হয়। উনি এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেননি। মিজানুর রহমান প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ অবস্থায় একজন এমডি কীভাবে বলেন, ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ। আমার এর উত্তর জানতে চাই।’

প্রিয় সংবাদ/রুহুল