গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হয় হৃদয়কে। ফাইল ছবি

রেনু হত্যার মূলহোতা ‘সবজি বিক্রেতা’ হৃদয়: দাবি পুলিশের

শুনানিতে বাদী পক্ষে আইনজীবী মাইদুল ইসলাম পলক ও জাহিদুল ইসলামসহ আরও অনেকে অংশ নিলেও, মামলার প্রধান আসামি হৃদয়ের পক্ষে কেউ দাঁড়াননি।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২৩:০১ আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২৩:০২
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২৩:০১ আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৯, ২৩:০২


গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হয় হৃদয়কে। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) রাজধানীর বাড্ডায় স্কুলে সন্তান ভর্তির খবর নিতে গিয়ে ‘ছেলেধরা’সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন তাসলিমা বেগম রেণু। এ ঘটনায় হৃদয় ৭-৮ জনের নাম বলেছে বলেও জানানো হয়।

২৪ জুলাই, বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন।

যেভাবে গ্রেফতার হয় হৃদয়

আবদুল বাতেন বলেন, ‘এই ঘটনার পর হৃদয় যখন জানতে পারে পুলিশ তাকে খুঁজছে, তখন সে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় পালিয়ে যায়। গ্রেফতার এড়াতে মাথার চুল ন্যাড়া করে ফেলে। সে ঢাকায় তার নানির সঙ্গে থাকতো। নানিকে সে বলে, তার জামাকাপড়গুলো পুড়িয়ে ফেলতে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে আমরা হৃদয়কে গ্রেফতার করি এবং তার ব্যবহৃত কাপড়গুলো উদ্ধার করি।’

রেনু হত্যায় বাকিদের নাম বলেনি পুলিশ

আবদুল বাতেন বলেন, ‘হৃদয় যাদের নাম বলেছে তদন্ত ও গ্রেফতারের স্বার্থে আমরা তাদের নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করছি না। যে অভিভাবক রেণুকে ছেলেধরা বলে সম্বোধন করেছিলেন, তার বিষয়েও আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি এবং বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘হৃদয় জানিয়েছে, সেসহ আরও ১০-১৫ জন দরজা ভেঙে ওই নারীকে (রেণু) বাইরে বের করে আনে। এরপর তাকে মারধর করে তারা। গণপিটুনির একপর্যায়ে রেনুর মৃত্যু হয়।’

বাবা-মা নেই সবজি বিক্রেতা হৃদয়ের

ডিবির এডিশনাল কমিশনার বলেন, ‘গ্রেফতার হৃদয়ের মা-বাবা নেই। সে বাড্ডা এলাকায় তার নানীর সঙ্গে বসবাস করতো। সে ওই এলাকার সবজি বিক্রেতা।

যেভাবে গণিপিটুনির শিকার হন হৃদয়

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ডিবি পুলিশ বলে, ঘটনার দিন ওই স্কুলের পাশে সবজি বিক্রি করছিল হৃদয়। সেদিন ওই নারী (রেনু) স্কুলে তার সন্তান ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে এলে একজন অভিভাবক তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় ওই অভিভাবকের সন্দেহ হলে রেনুকে ছেলেধরা বলে সম্বোধন করেন। হৃদয় এ কথা শুনে সবজি বিক্রি রেখে সেখানে ছুটে যায়। এ সময় সেখানে হৃদয় এবং ওই অভিভাবকসহ ১৫-২০ জন লোকের একটা জটলা তৈরি হয়।

এর মধ্যে স্কুল কর্তৃপক্ষ ভিকটিম রেনুকে তাদের স্কুলের একটি রুমে নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে ছোট জটলাটি বড় জটলায় রূপ নেয় এবং ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর লোকজন উত্তেজিত হয়ে স্কুলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে ১০-১৫ জনের একটি দল স্কুলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা তালা ভেঙে ওই নারীকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে এবং তাকে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান রেনু।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবদুল বাতেন বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। ‘‘পুলিশ ৪০ মিনিট পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায়’’ এই তথ্যটি সঠিক নয়। ঘটনার সময় পুলিশ পাশেই ছিল। তারা ঘটনার পরপরই সেখানে উপস্থিত হয় এবং জনগণকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, হাজার হাজার লোককে চার-পাঁচ জন পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’

পাঁচদিনের রিমান্ডে হৃদয়

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) লিয়াকত আলি আসামির রিমান্ডের দাবি করে বলেন, ‘আসামি হলো মাস্টারমাইন্ড। অন্যান্য আসামিদের খুঁজে বের করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রিমান্ড দাবি করছি। শুনানি শেষে প্রধান আসামি ইব্রাহিম ওরফে হৃদয় হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। আাদালতে আসামিকে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক।’

আদালেতে রেনু হত্যা নিয়ে যা বললো হৃদয়

শুনানির এক পর্যায়ে বিচারক আসামিকে জিজ্ঞেস করেন তার কোনো আইনজীবী আছে কিনা? হৃদয় জানায়, তার কোনো আইনজীবী নেই। তার মা-বাবাও নেই। এরপর বিচারক আবারও আসামিকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে হৃদয় বলে, ‘‘‘স্যার আমি সবজি বিক্রি করি। একজন মহিলা আমাকে বলে, একজন ছেলেধরা মহিলা ধরা পড়ছে।’’ তখন আমি গিয়ে দেখি ওই মহিলাকে একটা বাসায় তালাবদ্ধ করে রাখছে। ওইখানে অন্যান্য লোকেরা আগেই এ মহিলাকে মেরে রাস্তায় ফেলে দেয়। এরপর আমি যাই....।’

শুনানিতে কাঁদলেন আইনজীবীরা

রেনুকে পিটিয়ে হত্যা মামলার শুনানিতে কেঁদেছেন তার আইনজীবীরা। বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। শুনানিতে বাদী পক্ষে আইনজীবী মাইদুল ইসলাম পলক ও জাহিদুল ইসলামসহ আরও অনেকে অংশ নিলেও, মামলার প্রধান আসামি হৃদয়ের পক্ষে কেউ দাঁড়াননি।

শুনানিতে বাদী পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ‘একজন নারীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে এ আসামি (ইব্রাহিম ওরফে হৃদয় হোসেন মোল্লা) । ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে মধ্যযুগীয় কায়দায় ওই নারীকে হত্যা করা হয়। এ কথা বলে আইনজীবীরা কেঁদে ওঠেন।’

তারা বলেন, ‘স্যার মাথা কাটা, ছেলে ধরা; এটা শুধু গুজব নয়। এটা একটি কুচক্রিমহলের কাজ। এরা একটা গ্যাংয়ের সদস্য। এ আসামিকে রিমান্ডে নিলেই সব তথ্য উদ্ঘাটন হবে।’ এ সময় উপস্থিত অর্ধশতাধিক আইনজীবী আসামির সর্বোচ্চ রিমান্ড দাবি করেন।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (২০ জুলাই) সকালে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সন্তানের ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন তাসলিমা বেগম রেনু। এ সময় ছেলেধরা সন্দেহে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ঘটনায় ওই রাতেই বাড্ডা থানায় অজ্ঞাত ৪শ-৫শ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল