ছবিতে বামে হিউমেক ল্যাবের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মুবির মাহমুদ চৌধুরী এবং ডানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মুকিত আহমেদ। ছবি: প্রিয়.কম। 

(প্রিয় টেক) স্টার্টআপদের মানোন্নয়নে গত ১৪ নভেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সিডস্টারস ওয়ার্ল্ডের ঢাকা পর্বে জয়ী হয়েছে মোবাইলে অতিরিক্ত খরচ কমানোর জাদুকরী অ্যাপ ম্যাডভাইজার। পুরস্কার হিসেবে ম্যাডভাইজারের উদ্যোক্তারা সুইজারল্যান্ড এবং সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। আঞ্চলিক পর্যায়ে বিজয়ী ম্যাডভাইজার আগামী বছর সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় সিডস্টারস ওয়ার্ল্ডের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেবে। সেখানে বিজয়ীর জন্য থাকছে পাঁচ লাখ ডলার পুরস্কার। বাংলাদেশ বাছাই পর্বের আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং সিডস্টারস ওয়ার্ল্ড। ম্যাডভাইজার অ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান হিউমেক ল্যাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মুকিত আহমেদ জাদুকরী এই অ্যাপ এবং বাংলাদেশের অ্যাপস বাজারের বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন প্রিয়.কমের সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম. মিজানুর রহমান সোহেল। 

প্রিয়.কম: ম্যাডভাইজার অ্যাপ সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন। 

আবদুল মুকিত: বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস, ডেটা এবং বান্ডেল প্যাক রয়েছে কয়েক হাজার। এই প্ল্যানগুলোর মধ্যে আমার জন্য একটি বেস্ট আবার অন্যের জন্য আরেকটি বেস্ট। আবার আমাদের বিহেভিয়ার, কলিং প্যাটান্ট সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন হচ্ছে। কোন প্ল্যানটি গ্রহণ করলে আমার জন্য কাজে লাগবে এবং খরচ কমবে তা নির্ধারণ করা কঠিন। কিন্তু আমাদের অ্যাপ ৯৯% আপনার কল ও ডেটা স্টাডি করে আপনার জন্য কোনটি সেরা তা নির্ধারণ করে দিতে পারে। আমরা রেটিং ইঞ্জিন তৈরি করেছি। অ্যাপটি ইন্সটল করলে মোবাইলে থাকা কল লগ দেখে সে গ্রাফ করে দেখিয়ে দেয় গত সপ্তাহ বা মাসে কত টাকা খরচ হয়েছে। টাকার হিসেব করে তারপর বলে দেয় আপনি কোন প্যাকেজ ব্যবহার করলে খরচ কত শতাংশ কমে যাবে। সাজেস্ট করা প্যাকেজ চালু করার জন্য কোন কোড জানা দরকার নেই। শুধু অ্যাক্টিভ বাটনে ক্লিক করলেই অ্যাক্টিভ হয়ে যাবে। বর্তমানে যে আপনার এফএনএফ প্ল্যানে আছেন তাঁর সাথে কথা বলা কম হলে সেটাও পরিবর্তন করতে পরামর্শ দেবে। আবার সকল অপারেটরের মধ্যে আপনার কল লগ অনুযায়ী কোনটি সেরা সেটাই দেখাবে এখানে। 

অ্যাপটির প্রধান বৈশিষ্ট্য কি? 

আবদুল মুকিত: ম্যাডভাইজার অ্যাপটি তৈরি করেছে হিউমেক ল্যাব। অ্যাপটির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ভয়েস প্যাকেজ রিকমেন্ডেশন, ডাটা/ইন্টারনেট প্যাকেজ রিকমেন্ডেশন, বান্ডল প্যাকেজ রিকমেন্ডেশন, ক্যাম্পেইন রিকমেন্ডেশন, এফএনএফ রিকমেন্ডেশন এবং  মোবাইল রিচার্জ। অ্যাপটি বর্তমানে গুগল প্লেস্টোরে (https://goo.gl/N81Fl2) পাওয়া যাচ্ছে। আমরা চাচ্ছি ব্যবহারকারী যাতে দেখে, শুনে, বুঝে সেবাটি ব্যবহার করতে পারেন।

প্রিয়.কম: এই অ্যাপের আইডিয়া কিভাবে পেলেন? 

আবদুল মুকিত: গ্রামীণফোনে দীর্ঘ ১৩ বছর চাকরি করা অবস্থায় আমাকে বিল দিতে হয়নি। সেখান থেকে বের হয়ে আসার পর মোবাইলে কথা বলতে গিয়ে আমার অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। এই খরচ কিভাবে কমানে যায় তা চিন্তা করতে গিয়েই এই অ্যাপের কনসেপ্ট মাথায় আসে। গ্রামীণফোনে ১০ বছর চাকরি করা আমার আরেক সহকর্মী মুবির মাহমুদ চৌধুরী আর আমি মিলেই মোবাইলের খরচ কমাতে এই অ্যাপ নিয়ে কাজ শুরু করি।  

প্রিয়.কম: গ্রামীণফোন থেকে বের হওয়ার পর আপনার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কি ছিল? 

আবদুল মুকিত: আমরা মূলত অ্যাপ্লিকেশন নিয়েই কাজ করতে চাচ্ছিলাম। বড় কোন কিছু করতে হলে আমাদেরকে ফোন ভিত্তিক কিছু করতে হবে চিন্তা করছিলাম। কারণ এখন প্রায় সবার হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। এই সাহসেই অ্যাপস মার্কেটে চলে আসলাম। 

প্রিয়.কম: বাংলাদেশে আপনাদের মতো আর কোন রেটিং ইঞ্জিন আছে কি? 

আবদুল মুকিত: না। আমাদের জানা মতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র রেটিং ইঞ্জিন। আমরা ইতিমধ্যেই কপিরাইটে চলে গেছি। 

প্রিয়.কম: এই অ্যাপ থেকে আয়ের উৎস কি হবে?

আবদুল মুকিত: বিজ্ঞাপন। তবে মোবাইল অপারেটররাও এক সময় এখানে আসবে। প্রাথমিক অবস্থায় তাদের কাছে বিষয়টি ভয়ের কারণ হলেও শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তারা আসবে বলে আশা করছি। তাদের বিজ্ঞাপন বা কোন নির্দিষ্ট প্রোডাক্ট সেল করার ক্ষেত্রে আমাদের কমিশন দিতে পারে। 

প্রিয়.কম: এখন পর্যন্ত ম্যাডভাইজার অ্যাপ কতবার ডাউনলোড হয়েছে? 

আবদুল মুকিত: আমাদের কোন প্রমোশন ছাড়াই গত ৬ মাসে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার অ্যাপ ডাউনলোড হয়েছে। আগামী জানুয়ারির শেষের দিকে আমাদের পরবর্তী ভার্সন আসলে তখন এটার প্রমোশনে গেলে এ সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। 

প্রিয়.কম: কত জনের টিম মিলে এ প্রোজেক্টের কাজ করছেন? 

আবদুল মুকিত: আমাদের টিমে আছে ১২ জন। এর মধ্যে ৯ জন ডেভেলপার, দুজন আছেন সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগে এবং একজন আছেন এডমিনে। এছাড়া আমরা দুজন আছি পরিচালনা পর্ষদে। 

প্রিয়.কম: আপনাদের অ্যাপ দেখে মোবাইল অপারেটরদের প্রতিক্রিয়া কি?

আবদুল মুকিত: তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রথমে সবাই ভয় পায় যে বিল কমে যাবে। কিন্তু এটা তো সত্য কোন কিছুর মূল্য কমলে তার ব্যবহারও বেড়ে যায়। এতে কিন্তু মোবাইল অপারেটরদেরই লাভ হচ্ছে। কারণ গ্রাহক জেনেবুঝে কিন্তু তার দৃষ্টিতে সেরা প্রোডাক্টটাই কিন্তু নেবে। 

প্রিয়.কম: আমরা অনেক সময় দেখেছি একটি স্টার্টআপ কোম্পানি যখন বড় হয় তখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এগুলোকে অধিগ্রহণ করে। এমন সুযোগ আসলে কি করবেন? 

আবদুল মুকিত: নিঃসন্দেহে তখন এটি একটি চিন্তা করার বিষয় হবে। সেখানে গেলে আমাদের যদি উপকার হয় তাহলে আমরা নিশ্চয় যাবো। আর সুযোগ পেলে আমাদের আসলে যেতেই হবে। কারণ একা একা বেশিদূর যাওয়া বেশ কঠিন। 

প্রিয়.কম: সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অ্যাপস বাজারের অবস্থা কি?

আবদুল মুকিত: বাংলাদেশের প্রোফাইল অনুযায়ী অ্যাপসের বাজার বিশাল হবে। কারণ এদেশে অনেক পিসি নেই কিন্তু অনেক স্মার্টফোন আছে। প্রায় সব ধরণের প্রয়োজন মেটাতে অ্যাপস অগ্রগামী হিসেবে কাজ করবে। তবে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেট গেটওয়ে আসলে তখন অ্যাপস ব্যবসায়ীদের নতুন দোয়ার উন্মোচিত হবে। 

প্রিয়.কম: আপনাদের ব্যবসার উন্নয়নে সরকারের থেকে কি ধরণের সহযোগিতা আশা করেন?

আবদুল মুকিত: সরকার এখাতে অনেক কিছুই করছে। তবে এখানে প্রফেশনাল ট্রেনিং বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বেসিস মিলে প্লে স্টোর থেকে অ্যাপস ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে সেটা অনেক কাজের হবে। 

প্রিয়.কম: ইউজারদের সিকিউরিটির বিষয়টি কিভাবে নিশ্চিত করছেন? তাদের ডেটা চুরি হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কি? 

আবদুল মুকিত: আমরা ইউজারদের ব্যক্তিগত কোন ডেটা নেই না। আমরা মূলত দেখি আপনি যে প্যাকেজটি গ্রহণ করছেন সেটার ডেটা। কিন্তু আমরা ভাইবারের মতো পুরো ফোনবুক নিয়ে নেওয়ার মতো কোন কাজ করি না। 

প্রিয়.কম: বাংলাদেশের অ্যাপস বাজারে চাকরি ও ব্যবসা করার সুযোগ কেমন দেখছেন?

আবদুল মুকিত: আমার মনে হয় অ্যাপস হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র। আগে যা কম্পিউটারে ছিল এখন তার সবই অ্যাপে। এখানে বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট বা সার্ভিস যাই বলেন না কেন তার সবকিছুই আছে। অ্যাপ আসলে একটি ইন্টারফেস। মূলত এর পেছনেই রয়েছে বিশাল ব্যবসা ক্ষেত্র। সুতরাং অ্যাপসকে সামনে রেখে যখন বিজনেস শুরু হবে তখন চাকরির ক্ষেত্র এমনিতেই তৈরি হবে। 

প্রিয়.কম: আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

আবদুল মুকিত: ২০১৭ সালের মধ্যে শুধু বাংলাদেশের ৫০ লাখ সাবস্ক্রাইবার তৈরি করতে চাই। এছাড়া শিগগির আমরা দেশের বাইরের মোবাইল অপারেটরদের নিয়েও কাজ করার ইচ্ছা আছে। তবে সবার আগে আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতের অপারেটরদের সাথে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।